সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
‘বাগডোগরা দিয়ে পালাচ্ছিল। মুম্বই থেকে এসেছিল। মুম্বই থেকে বিজেপি ধার করে ওই মিমকে নিয়ে এসেছে। আইএসএফ ওদের সাথে। কংগ্রেসেরও উস্কানি আছে। আর বিজেপিরও উস্কানি আছে। বিহারে এরা ভোট কেটে বিজেপিকে জিতিয়েছিল ..বিজেপির টাকায়…আর যে দাঙ্গা করেছিল পরশুদিন, সেটাও এরাই করেছিল।’ মালদহের কালিয়াচকের মোথা বাড়িতে বিচারকদের ঘেরাও করে হেনস্থার ঘটনায় মূল অভিযুক্ত মোফাক্কারুল ইসলাম গ্রেপ্তার হওয়ার পরেই মালদহের মাটিতে দাঁড়িয়ে বিস্ফোরক অভিযোগ করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
বুধবার রাতের ঘটনার পর বৃহস্পতিবার মুর্শিদাবাদের সাগরদিঘির জনসভা থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘আপনারা জানেন, এখন প্রশাসন আমার হাতে নেই। আইন-শৃঙ্খলা পুরোটাই আমার হাত থেকে কেড়ে, নির্বাচন কমিশন হাতে নিয়েছে।’ এই বক্তব্যের মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শুক্রবার মোথাবাড়িতে গাড়িতে উঠে উস্কানিমূলক বক্তৃতা দেওয়া আইনজীবী মোফাক্কারুল ইসলামকে বাগডোগরা বিমানবন্দর থেকে গ্রেফতার করা হয়। ধৃত ব্যক্তির নাম মোফাক্কারুল ইসলাম। ধৃত মোফাক্কারুলের সহযোগী এক্রামুলকেও ধরে সিআইডি। বাগডোগরা বিমানবন্দর থেকে মোফাক্কারুলের এক সহযোগী, এক্রামুল বাগানীওকেও গ্রেফতার করা হয়েছে। মোথাবাড়িকাণ্ডে ইতিমধ্যেই ভাইরাল হয়েছে মোফাক্কারুলের একাধিক ভিডিও। কালিয়াচক ২ নম্বর বিডিও অফিসে অশান্তির সময় গাড়ির মাথায় উঠে বক্তৃতা করতে দেখা গেছে তাঁকে। পুলিশের দাবি, মোফাক্কারুলই ঘটনার মূল প্ররোচনাকারী। পুলিশ জানিয়েছে, বুধবার কলকাতা থেকে ইটাহার ফেরার সময় কালিয়াচক ২ নম্বর বিডিও অফিসের সামনে ঘৃণা-ভাষণ দেন মোফাক্কারুল। সেই সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন সহযোগী এক্রামুলও।
শুক্রবার হরিরামপুরের জনসভার মঞ্চে দাঁড়িয়ে মমতা সেই গ্রেপ্তারের কথা জানিয়ে জনতার উদ্দেশ্যে বলেন, ‘মনে রাখবেন, পরিকল্পনা করে, পরিকল্পিত করে, এনআইএ আসার আগেই , আমাদের সিআইডি, যেটা এখনও আমি দেখি, সেই সিআইডি, ইলেকশন কমিশনের আন্ডারে পড়ে না, সেই সিআইডি তাকে গ্রেফতার করেছে।’
এদিন রায়গঞ্জের সভায় বক্তব্যের শুরুতেই বিজেপিকে তোপ দেগে মমতা বলেন, ‘বাইরের লোক দিয়ে টাকা, গুন্ডা আমদানি করছ। বাংলার বদনাম করছ। তোমরা বদলা নিতে গিয়ে, পিছন থেকে খেলা করছ। লজ্জা করে না বিজেপি, আমি হলে তো গলায় দড়ি দিয়ে মরতাম।’ এরপর তিনি তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থীদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘প্রার্থীদের বলে রাখি, বিজেপি ভ্যানিশ ওয়াশিং মেশিন। তারা নির্দেশ দিয়েছে ডিএমদের, তৃণমূলের প্রার্থীদের বাতিল করো। যাঁরা মনোনয়ন করবেন তাঁরা ভাল করে দেখে নেবেন। বিজেপি যেটা গেমপ্ল্যান করবে, সেটা ভেস্তে দিতে হবে।’
পাশাপাশি কেন্দ্রীয় বাহিনীকে নিশানা করে এলাকার মহিলাদের বড় বার্তা দিয়ে এদিন মমতা বলেন, ‘ভোটের আগে কেন্দ্রীয় বাহিনীকে দিয়ে ভয় দেখানোর চক্রান্ত করেছে। ভোটের দিন ভোট দিতে যাওয়ার রাস্তা আটকানোর চেষ্টা করলে মা-বোনেরা ঝাঁট দিয়ে রাস্তা পরিষ্কার করবেন।’ এর পরেই হুঙ্কারের সুরে তৃণমূল সুপ্রিমো বলেন, ‘সব কিছু করব আমরা, আর বিজেপি ভোট কেটে গুটিয়ে দেবে গণতন্ত্রের চামড়া। বিজেপি হচ্ছে বাবলা কাঁটা, মানুষের নাম ছাঁটা। যারা চায় বাংলার সর্বনাশ, তাদের আমরা করব বিনাশ। আপনার গণতন্ত্র কেড়ে নিচ্ছে, ভোটাধিকার কেড়ে নিচ্ছে। ডিটেনশন ক্যাম্পে পাঠাবে। মাছ, ডিম খেতে দেবে না। ওদের ধর্মের নাম অধর্ম। আর আমাদের ধর্মের নাম মানবধর্ম।’
এ দিন জেলাবাসীকে সতর্ক করে তৃণমূল সুপ্রিমো বলেন, ‘বাংলার বদনাম করা। সংখ্যালঘুদের ক্ষেপিয়ে দিয়ে অশান্তি করার চেষ্টা করছে। চক্রান্ত করে সব অফিসারদের ট্রান্সফার করছে। অন্যান্য রাজ্যে ১০-১১ জনকে বদলি করেছে। আর বাংলায় চারশোর উপর রদবদল হয়েছে। বাসে করে গুজরাট থেকে লোক আনছে। এ দিকে পরিযায়ী শ্রমিকদের ফিরতে টিকিট দিচ্ছে না।’
বিজেপি আসন পুনর্বিন্যাস করে বাংলা ভাগের চক্রান্ত করছে বলে অভিযোগ করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘বিহার আর বাংলার কয়েকটা এলাকাকে নিয়ে আলাদা রাজ্য করার পরিকল্পনা করেছে। তবে তার আগেই ওরা হারবে। ২০২৬-এই হারাব।’ বিজেপি ভোটের দিনও গন্ডগোল পাকাতে পারে বলে সতর্ক করেছেন নেত্রী। মা-বোনেদের ঝাঁটা হাতে পাহারা দেওয়ার পরামর্শ মমতার। তিনি বলেন,’লক্ষ্মীর ভান্ডার, যুবসাথী চান? তা হলে মা-বোনেরা, ভাইয়েরা এলাকায় নজর রাখুন।’

এদিনের সভা থেকে উন্নয়নের একাধিক প্রতিশ্রুতিও দেন মুখ্যমন্ত্রী। ক্ষমতায় এলে প্রত্যেকের জন্য পাকা বাড়ি ও পানীয় জলের ব্যবস্থা করা হবে বলে আশ্বাস দেন। পাশাপাশি সতর্ক করে নেত্রীর দাবি, তৃণমূল ক্ষমতায় না এলে সাধারণ মানুষের ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা প্রসঙ্গেও সচেতনতার বার্তা দেন তিনি। সাধারণ মানুষকে অচেনা ব্যক্তির সঙ্গে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট বা ফোন নম্বর শেয়ার না করার পরামর্শ দেন তিনি।