TMC Leaders join BJP : সুন্দরবনে তৃণমূলের ‘গড়’ তছনছ! ভোটের মুখে শুভেন্দুর বড় চাল, ঘাসফুল ছেড়ে পদ্মে একঝাঁক নেতা
সুষমা পাল মন্ডল। কলকাতা সারাদিন।
২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের নির্ঘণ্ট ঘোষণা হতেই দক্ষিণবঙ্গে নিজেদের জমি শক্ত করতে ঝাঁপিয়েছে বিজেপি। এবার সেই তালিকায় যুক্ত হলো দক্ষিণ ২৪ পরগনার সুন্দরবন এলাকা। দীর্ঘদিনের জল্পনার অবসান ঘটিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের একঝাঁক দাপুটে নেতা ও কয়েক হাজার কর্মী মঙ্গলবার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর উপস্থিতিতে গেরুয়া শিবিরে নাম লেখালেন।
দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলার ক্যানিং-১ ব্লক ও গোসাবা ব্লকে তৃণমূলে বড়সড় ভাঙন ধরালো বিজেপি। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় কলকাতার ৬ মুরলীধর সেন লেনে রাজ্য বিজেপির কার্যালয়ে দু’দফায় এই যোগদান কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। জেলা পরিষদে তৃণমূলের বর্তমান ও প্রাক্তন কর্মাধ্যক্ষ, ব্লক সভাপতি থেকে শুরু করে পঞ্চায়েত প্রধান পর্যন্ত এদিন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর হাত থেকে দলীয় পতাকা নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিজেপিতে যোগদান করেন।
যোগদানকারীদের তালিকায় নাম রয়েছে শৈবাল ব্যানার্জি, সিরাজউদ্দিন দেওয়ান, প্রাক্তন প্রধান প্রতিভা, প্রাক্তন উপপ্রধান হাসমত মোল্লাদের। এছাড়াও নন্দকিশোর সর্দার, মর্তুজা শেখ, অর্ণব রায়, সঞ্জয় নস্কর, সালাউদ্দিন সর্দার ও শম্ভু বৈদ্যরা এদিন পদ্মশিবিরে নাম লেখান। শুভেন্দু আরও একগুচ্ছ নাম ঘোষণা করেন, যার মধ্যে রয়েছেন গণেশ মণ্ডল, কালীচরণ সর্দার, মনোজ নস্কর, বিষ্ণু নস্কর, কার্তিক মণ্ডল, অসিত মণ্ডল, ধনঞ্জয় সাঁপুই এবং দীপঙ্কর মণ্ডলরা।
কেন দল ছাড়লেন? যোগদানকারীদের অভিযোগ, শাসকদলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল, স্বজনপোষণ আর দুর্নীতির জেরে দমবন্ধ হয়ে আসছিল তাঁদের। সাধারণ মানুষের হয়ে কাজ করার কোনও সুযোগ ছিল না। এলাকায় তৃণমূলের ‘তোলাবাজি’ আর ‘ভয়ের রাজনীতি’ অসহ্য হয়ে ওঠায় তাঁরা বিজেপির উন্নয়নমূলক রাজনীতিতে আস্থা রাখছেন। শুভেন্দুর কথায়, “যাঁদের বিরুদ্ধে চুরি, ছাপ্পা ভোট বা সন্ত্রাসের অভিযোগ নেই, সংগঠনের সঙ্গে পরামর্শ করে সেই সব বিশিষ্ট লোকেদেরই আমরা দলে নিচ্ছি।”
ঐতিহাসিকভাবে দক্ষিণ ২৪ পরগনা তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত হলেও, পঞ্চায়েত নির্বাচন ঘিরে ক্ষোভ এবং গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব এখন প্রকাশ্যে। শুভেন্দু দাবি করেছেন, এই যোগদান আসলে তৃণমূলের ‘পতন’-এর শুরু। ২০২৬-এর নির্বাচনে দক্ষিণ ২৪ পরগনায় বিজেপির জয়রথ কেউ আটকাতে পারবে না। তাঁর দাবি, আরও অনেক তৃণমূল নেতা-কর্মী শান্তিতে কাজ করতে বিজেপির সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন।
শুভেন্দু বলেন, “গোসাবা ব্লক থেকে আমরা তৃণমূলকে কার্যত শূন্য ঘোষণা করতে পারি। আমরা বলতে পারি যে গোসাবা ব্লকে এবারে মমতা ব্যানার্জিকে বইনি করতে দেবো না। সন্দেশখালি হিঙ্গলগঞ্জ থেকে সাগর পর্যন্ত একটা আসনও তৃণমূল এবারে পাবে না।”
যোগদান কর্মসূচির আগে শুভেন্দু অধিকারী বলেন, “তৃণমূল কংগ্রেস তার রাজনৈতিক পথ, মত এবং সত্তা বিসর্জন দিয়ে এখন আইপ্যাক এবং পুলিশ নির্ভর একটি কোম্পানিতে পরিণত হয়েছে। স্বাভাবিকভাবে তৃণমূল কংগ্রেসের পুনরুত্থান হয়েছিল নন্দীগ্রাম পরবর্তী সময়ে দক্ষিণ ২৪ পরগনা এবং পূর্ব মেদিনীপুর থেকে। সেই সময় দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলায় বামপন্থী এবং এসইউসিআই-এর দুর্গ তছনছ করে যারা তৃণমূল কংগ্রেসকে প্রতিষ্ঠা দিয়েছিলেন তার মধ্যে অনেক নেতৃত্ব আজ নেই এবং অনেক নেতৃত্বকে আজ কার্যত বসিয়ে দেওয়া হয়েছে বা অপমানিত করা হয়েছে।”
তিনি বলেন, “বিধানসভার নির্বাচনে তৃণমূলের জন্ম লগ্ন থেকে যারা যুক্ত ছিলেন তাদেরকে নির্বাসনে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। এটা রাজ্যসভার মনোনয়ন থেকে স্পষ্ট হয়ে গেছে। এর আগে রাহুল দার মনোনয়নের সময় আমি বলেছিলাম সুব্রত বক্সীকে কার্যত অবসরে পাঠানো হয়েছে। ফোর্সফুল রিটায়ারমেন্ট। তার জায়গায় কোয়েল মল্লিক, বাবুল সুপ্রিয়রা দিল্লি গেছেন। এমনকি বাংলা-বাঙালি ইত্যাদি বলা অভয়াকান্ডে প্রমাণ লোপাট করা বিনীত গোয়েলকে যিনি বাঁচিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের লড়াই করে সেই মেনকা গুরুস্বামীকেও রাজ্যসভায় পাঠাতে পিছপা হয়নি। তারপরে প্রার্থী তালিকায় দেখেছেন কিভাবে ঘাড় ধাক্কা খেয়েছেন খগেশ্বর রায়,রফিকুর রহমান,তপন চট্টোপাধ্যায় মিলে অসংখ্য জন।”
শুভেন্দু অধিকারী বলেন, “কেউ বলেছে ৬৫ লাখ চেয়েছিল দিতে পারেনি। কেউ বলেছেন দু’কোটি চেয়েছিল দিতে পারেনি। কেউ বলেছিল আমার টাকা নেই তাই আইপ্যাক আমার নাম রেকমেন্ড করেনি। এই অবস্থা পরিণত হওয়ার পরে দক্ষিণ চব্বিশ পরগণায় তৃণমূল কংগ্রেসের অনেক নেতাই নির্ভরযোগ্য বিকল্প হিসেবে রাষ্ট্রবাদী ভারতীয় জনতা পার্টির সঙ্গে আসতে চেয়েছেন বা চান। এরকম আমার সঙ্গে, কেউ কেউ সুকান্ত মজুমদারের সঙ্গে, কেউ কেউ শমীক ভট্টাচার্যের সঙ্গে, অনেক স্তরে আলোচনা করেছেন।”
তিনি বলেন, “আমরা স্থানীয় সংগঠনের সঙ্গে পরামর্শ করে, যাদের সঙ্গে বিজেপি সংগঠনের সুস্থ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থাকলেও চুরিচামারি, ছাপ্পা, ভোট, রিগিং, ভোট পরবর্তী হিংসায় বিজেপি কর্মীদের ওপর সন্ত্রাস প্রভৃতি এমন কোন গুরুতর অভিযোগ যাদের বিরুদ্ধে নেই এবং বিশেষ করে বিশিষ্ট মানুষ, যারা এক সময় ১৯৯৮ সালে জোটে লড়াই করেছেন, সেই নেতৃত্বকে আমরা যোগদান করাচ্ছি।”

তিনি জানান, প্রথম পর্যায়ে মাননীয় ক্যানিং-১ ব্লকের তৃণমূলের সভাপতি শৈবাল লাহিড়ী,দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার প্রাক্তন সহকারি সভাধিপতি (২০১৩ থেকে ১৮) এবং প্রাক্তন বিদ্যুৎ কর্মাধ্যক্ষ , প্রাক্তন উপপ্রধান, প্রাক্তন প্রধানদের যোগদান করানো হয়েছে। দ্বিতীয় দফায় দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলা পরিষদের উপাধ্যক্ষ অনিমেষ মন্ডলের নেতৃত্বে গোসাবা ব্লকের পঞ্চায়েত সমিতি এবং গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রায় সব বিজেপিতে যোগদান করেছে বলে দাবি করেন শুভেন্দু।

তিনি বলেন, “তিনজন পঞ্চায়েত প্রধানসহ গোসাবা ব্লক থেকে আমরা তৃণমূলকে কার্যত শূন্য ঘোষণা করতে পারি। আমরা বলতে পারি যে গোসাবা ব্লকে এবারে মমতা ব্যানার্জিকে বউনি করতে দেবো না। সন্দেশখালি হিঙ্গলগঞ্জ থেকে সাগর পর্যন্ত একটা আসনও তৃণমূল এবারে পাবে না। আজকে গোসাবার জয়েনিং এর মধ্য দিয়ে তার সূচনা আমরা করে দিলাম।”

রাজনৈতিক মহলের মতে, দক্ষিণ ২৪ পরগনার মতো তৃণমূলের ‘দুর্গে’ এই ভাঙন শাসকদলের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হতে পারে।