অভিষেকের নেতৃত্বে অনাস্থা? নতুন দলনেতা বাছাইয়ে তৃণমূলের বিদ্রোহী শিবির, জল্পনা বাড়ালেন শুভেন্দু
শৌনক মন্ডল। কলকাতা সারাদিন। নয়াদিল্লি।
দিল্লির রাজনৈতিক অন্দরে সোমবার রাতটা যেন থ্রিলারের চিত্রনাট্য। একদিকে তৃণমূলের বিদ্রোহী সাংসদদের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক, অন্যদিকে সেই বৈঠক শুরুর মুখেই আচমকা পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর উপস্থিতি। আর তাতেই নতুন করে তুঙ্গে উঠেছে বাংলার রাজনীতির জল্পনা।
সূত্রের খবর, লোকসভায় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিবর্তে নতুন দলনেতা নির্বাচনের লক্ষ্যে বীরভূমের সাংসদ শতাব্দী রায়ের দিল্লির বাসভবনে বৈঠকে বসেন তৃণমূলের বিদ্রোহী সাংসদরা। বৈঠকের গুরুত্ব এমনিতেই ছিল অত্যন্ত বেশি। তার উপর শুভেন্দুর উপস্থিতি গোটা ঘটনাকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।
রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, এই সফর নিছক সৌজন্য সাক্ষাৎ নয়। বরং জাতীয় স্তরের রাজনৈতিক সমীকরণের সঙ্গে এর যোগ থাকতে পারে বলেই মনে করা হচ্ছে। বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বের কোনও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা নিয়েই শুভেন্দু সেখানে পৌঁছেছেন কি না, তা নিয়েও শুরু হয়েছে জোর আলোচনা।
দিনের শুরু থেকেই অবশ্য বিদ্রোহী শিবির ছিল যথেষ্ট সক্রিয়। সকালে কাকলি ঘোষদস্তিদারের সরকারি বাংলোতে বৈঠকে মিলিত হন বিদ্রোহী সাংসদরা। সেখানে অন্তত ১৪ জন সাংসদের উপস্থিতি ছিল বলে জানা গেছে। দীর্ঘ আলোচনা শেষে তাঁদের একটি প্রতিনিধিদল বিজেপির অন্যতম শীর্ষ সংগঠক ভূপেন্দ্র যাদবের বাসভবনে যায়।
ঘটনাচক্রে সেই সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও। ফলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের কাছে দিনের ঘটনাপ্রবাহ আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। প্রায় দুপুর পর্যন্ত চলা ওই বৈঠকের পর কাকলি ঘোষদস্তিদার সাংবাদিকদের সামনে বড় দাবি করেন।
তাঁর বক্তব্য, মোট ২০ জন সাংসদ নিজেদের পৃথক গোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতির দাবিতে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লাকে চিঠি পাঠিয়েছেন। শুধু তাই নয়, তাঁরা এনডিএ-কে সমর্থন করার সিদ্ধান্তও নিয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে।
যদিও স্পিকারের সঙ্গে সেদিন সরাসরি সাক্ষাৎ সম্ভব হয়নি। তিনি দিল্লির বাইরে থাকায় পরে আবার সময় চাওয়া হবে বলেও বিদ্রোহী শিবির সূত্রে জানানো হয়েছে।
এরপরই সন্ধ্যায় নজর ঘুরে যায় শতাব্দী রায়ের বাসভবনের দিকে। কারণ, বিদ্রোহী সাংসদদের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল—এই গোষ্ঠীর নেতৃত্ব কে দেবেন? অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিকল্প হিসেবে কাকে সামনে আনা হবে, তা নিয়েই মূলত আলোচনা শুরু হয়।
বৈঠকে একে একে পৌঁছাতে থাকেন বিভিন্ন জেলার সাংসদরা। মথুরাপুরের বাপি হালদার, মুর্শিদাবাদের আবু তাহের খান, বোলপুরের অসিত কুমার মাল থেকে শুরু করে জঙ্গিপুরের খলিলুর রহমান, বর্ধমান পূর্বের শর্মিলা সরকার এবং কোচবিহারের জগদীশ চন্দ্র বসুনিয়া—একাধিক সাংসদের উপস্থিতি বৈঠকের গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দেয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বৈঠক শুধুমাত্র নেতৃত্ব নির্বাচন নয়, বরং আগামী দিনে বাংলার বিরোধী ও শাসক রাজনীতির নতুন সমীকরণ তৈরির ক্ষেত্রেও বড় ভূমিকা নিতে পারে।
বিশেষ করে লোকসভায় তৃণমূলের অবস্থান, কেন্দ্রের সঙ্গে সম্পর্ক এবং এনডিএ-র প্রতি সম্ভাব্য সমর্থনের প্রশ্ন এখন জাতীয় রাজনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে।

তবে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন একটাই—বিদ্রোহী সাংসদদের এই শক্তিপ্রদর্শন কি শুধুই চাপ তৈরির কৌশল, নাকি সত্যিই বাংলার রাজনীতিতে বড় ভাঙনের সূচনা হয়ে গেল?
শতাব্দীর বাড়ির বৈঠক শেষ হলে হয়তো কিছু উত্তর মিলবে। কিন্তু তার আগে দিল্লির রাজনৈতিক করিডরে ঘুরছে একটাই ফিসফাস—তৃণমূলের অন্দরমহলের এই ঝড় ঠিক কোথায় গিয়ে থামবে?