ওম বিড়লার উপস্থিতিতে ওরিয়েন্টেশন শিবির ঘিরে অভিযোগের সূত্রপাত, বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশের পরই বড় পদক্ষেপ বিধানসভা সচিবালয়ের।
সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার ইতিহাসে এমন ঘটনা আগে ঘটেছে কি? রাজনৈতিক মহলে এখন ঘুরছে সেই একটাই প্রশ্ন। কারণ, এই প্রথম কোনও দায়িত্বপ্রাপ্ত মার্শালকে সরকারি নির্দেশে সাসপেন্ড করা হয়েছে। আর সেই সিদ্ধান্ত ঘিরেই জোর চর্চা শুরু হয়েছে বিধানসভার অন্দর থেকে রাজনৈতিক মহল পর্যন্ত।
বিধানসভা (West Bengal Legislative Assembly) সূত্রে জানা গিয়েছে, মার্শাল-এবং-সিকিউরিটি অফিসার দেবব্রত মুখোপাধ্যায়ের (Debabrata Mukhopadhyay) বিরুদ্ধে দায়িত্ব পালনে গাফিলতি, অসৌজন্যমূলক আচরণ এবং বিধায়কদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের একাধিক অভিযোগ জমা পড়েছে। অভিযোগের গুরুত্ব বিচার করেই তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে তাৎক্ষণিকভাবে সাসপেন্ড করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিধানসভা সচিবালয়।
ঘটনার সূত্রপাত সম্প্রতি আয়োজিত ১৮তম বিধানসভার নবনির্বাচিত বিধায়কদের পরিচিতি বা ওরিয়েন্টেশন কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে। সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা (Om Birla)। এত গুরুত্বপূর্ণ একটি সরকারি কর্মসূচিতে দায়িত্বে থাকা সত্ত্বেও মার্শালের আচরণ নিয়ে একাধিক বিধায়ক অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন বলে সূত্রের দাবি।
শুধু মৌখিক অভিযোগই নয়, কয়েকজন বিধায়ক শাসক দলের মুখ্য সচেতকের কাছেও লিখিতভাবে বিষয়টি জানিয়েছেন বলে খবর। তাঁদের অভিযোগ, দায়িত্ব পালনের সময় প্রয়োজনীয় শিষ্টাচার বজায় রাখা হয়নি এবং বিধায়কদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক ব্যবহার করা হয়েছে। এই অভিযোগের ভিত্তিতেই গোটা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা শুরু করে বিধানসভা কর্তৃপক্ষ।
বিধানসভা সচিবালয়ের জারি করা সরকারি বিজ্ঞপ্তি (No. 911 L.A/Estab.) অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের শৃঙ্খলা ও শাস্তিমূলক বিধির ১০ নম্বর ধারা অনুসারে দেবব্রত মুখোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক বিভাগীয় তদন্ত শুরু করা হয়েছে। পাশাপাশি একই বিধির ৭(১)(এ) ধারা অনুযায়ী তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে সাসপেন্ড রাখার নির্দেশ কার্যকর হয়েছে।
সরকারি নিয়ম মেনেই সাসপেনশন চলাকালীন তিনি জীবনধারণের জন্য নির্ধারিত ভাতা পাবেন। ইতিমধ্যেই এই নির্দেশের কপি অ্যাকাউন্ট্যান্ট জেনারেল, অর্থ দফতর এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য দফতরে পাঠানো হয়েছে বলে বিধানসভা সূত্রে জানা গিয়েছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, ঘটনাটি শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বিধানসভার শৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। কারণ, মার্শালের দায়িত্ব শুধুমাত্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নয়, বিধানসভার মর্যাদা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখাও তাঁর অন্যতম প্রধান কর্তব্য। সেই জায়গাতেই প্রশ্ন উঠেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, বিধানসভার ভেতরে নিরাপত্তা, সদস্যদের চলাচল এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব মার্শাল ও তাঁর টিমের উপরেই থাকে। অধিবেশন চলাকালীন কোনও বিশৃঙ্খলা তৈরি হলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার দায়িত্বও তাঁদেরই।

সম্প্রতি অধিবেশন চলাকালীন তৃণমূল নেতা কুণাল ঘোষ (Kunal Ghosh)কে সভাকক্ষ থেকে বের করে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন অধ্যক্ষ রথীন্দ্র বোস (Rathindra Bose)। সেই সময়ও মার্শাল দেবব্রত মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন নিরাপত্তা দলই দায়িত্ব পালন করেছিল। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর বিরুদ্ধে এমন কড়া প্রশাসনিক পদক্ষেপ রাজনৈতিক মহলেও কৌতূহল তৈরি করেছে।
এখন নজর বিভাগীয় তদন্তের দিকে। তদন্তে অভিযোগ কতটা প্রমাণিত হয়, তার উপরই নির্ভর করবে দেবব্রত মুখোপাধ্যায়ের ভবিষ্যৎ। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—বিধানসভার দীর্ঘ ইতিহাসে এই সিদ্ধান্ত ইতিমধ্যেই এক নতুন নজির তৈরি করেছে।
এখন প্রশ্ন একটাই—বিভাগীয় তদন্তে আর কী কী তথ্য সামনে আসবে? আর এই বিতর্কের শেষ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? রাজনৈতিক মহল এখন সেই উত্তরই খুঁজছে।