সুষমা পাল মন্ডল। কলকাতা সারাদিন।
পৃথ্বী, জল, অগ্নি, বায়ু ও আকাশ—প্রকৃতির পাঁচ উপাদানকে কেন্দ্র করে এক অসাধারণ সাংস্কৃতিক উপস্থাপনা। কচিকাঁচাদের চোখে প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতা, মুনি-ঋষিদের জ্ঞানচর্চা থেকে আধুনিক পৃথিবীর পরিবেশ সংকট - সব মিলিয়ে সোনারপুরের জ্যোতির্ময় পাবলিক স্কুলের ২৩ তম বাৎসরিক অনুষ্ঠানে দেখা মিলল এক অন্য স্বাদের শিক্ষা ও সংস্কৃতির মেলবন্ধন।
দক্ষিণ ২৪ পরগনার প্রত্যন্ত এলাকার সোনারপুরের বুকে ২০০৪ সালে অনেক স্বপ্ন নিয়ে জ্যোতির্ময় পাবলিক স্কুলের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড. পার্থসারথি গঙ্গোপাধ্যায়। মূলত দীর্ঘকাল ধরে বিশেষ করে সিপিএম আমলে যেভাবে বাংলার ছাত্র-ছাত্রীদের ইংরেজি শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল তাদেরকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর পাশাপাশি আত্মবিশ্বাসে করে তোলার জন্য সোনারপুরের বুকে ইংরেজি মিডিয়াম স্কুল তৈরি করেন পার্থসারথি। ঠিক যেমন ভাবে মহাভারতের যুদ্ধে অর্জুনকে সঠিক পরামর্শ দিয়ে যুদ্ধজয়ের পথে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন পার্থর সারথী অর্জুন, ঠিক সেভাবেই সোনারপুর তথা বাংলার প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের ছেলেমেয়েদের স্বল্প খরচে ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত করে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার লক্ষ্যে পৌঁছে দেওয়ার কাজ করে চলেছেন পার্থসারথি ( Partha Sarathi Ganguly )। শনিবার স্কুলের ২৩ তম বাৎসরিক অনুষ্ঠানে নিজের সেই স্বপ্নকে বাস্তবায়নের পথে লড়াইয়ের অভিজ্ঞতার কথাও শোনালেন তিনি।
এই লড়াইয়ে তিনি সঙ্গে পেয়েছেন স্কুলের প্রিন্সিপাল তথা সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ হিসেবে বারে বারে স্বীকৃতি পাওয়া সুশান্ত দাসকে ( Sushant Das )। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন উত্তরবঙ্গের বুকে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল থেকে নিজের ভাইকে করে অসুস্থ মানুষকে হাসপাতালে পৌঁছে দিয়ে বাইক অ্যাম্বুলেন্স দাদা উপাধি পাওয়া পদ্মশ্রী করিমুল হক ( Bike ambulance Dada )। উপস্থিত ছিলেন জ্যোতির্ময় পাবলিক স্কুলের ছোটদের শাখা জ্যোতি শিশু বিহারের ( Jyoti Shishu Vihar ) সোনারপুর শাখার হেড মিস্ট্রেস সিলকা সালোনি বিশোয়াল ( Silka Saloni Biswal ), জেএসভি শ্রীরামচন্দ্রপুরের হেডমিস্ট্রেস মনীষা দে, শিউলি নাগ, প্রিয়াঙ্কা গাঙ্গুলী সহ বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব। ছিলেন বিশিষ্ট চিত্রকর ক্ষীতিশ বিশাল।
পঞ্চতত্ত্ব - দ্য এলিমেন্টাল ওডিসি
(Panchatattva - The Elemental Odyssey )
আজকের প্রজন্মের হাতে স্মার্টফোন, চোখের সামনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্ময়। চ্যাটজিপিটি থেকে আধুনিক মহাকাশ গবেষণা—প্রযুক্তির অভাবনীয় অগ্রগতির সাক্ষী তারা। কিন্তু যে সভ্যতার শিকড়ের উপর দাঁড়িয়ে আজকের এই আধুনিক পৃথিবী, সেই সভ্যতার জন্মকথা কতটা জানে আমাদের নতুন প্রজন্ম? জানে কি, প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সহাবস্থানের সেই আদিম দর্শন? জানে কি, হাজার হাজার বছর আগে ভারতবর্ষের মাটিতে বসেই মুনি-ঋষিরা কীভাবে মহাবিশ্ব, গ্রহ-নক্ষত্র, গণিত, দর্শন ও বিজ্ঞানের নানা বিষয় নিয়ে গভীর চর্চা করেছিলেন?
এই প্রশ্নগুলিকেই যেন নতুন করে সামনে নিয়ে এল সোনারপুরের জ্যোতির্ময় পাবলিক স্কুল। তাদের অভিনব ভাবনা, 'পঞ্চতত্ত্ব – দ্য এলিমেন্টাল ওডিসি'। শুধু একটি বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়, বরং প্রকৃতি, সভ্যতা, ইতিহাস, ভারতীয় ঐতিহ্য এবং পরিবেশ সচেতনতার এক অসাধারণ দৃশ্যকাব্য।
পৃথ্বী, জল, অগ্নি, বায়ু ও আকাশ—এই পাঁচটি তত্ত্বকে ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে গোটা উপস্থাপনা। প্রাচীন ভারতীয় দর্শনে এই পঞ্চতত্ত্বকে মানবজীবন ও বিশ্বপ্রকৃতির অন্যতম মৌলিক ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সেই দর্শনকে অবলম্বন করেই মঞ্চে মঞ্চে ফুটে উঠেছে পৃথিবীর সৃষ্টি, প্রকৃতির বিবর্তন, মানবসভ্যতার ক্রমবিকাশ এবং মানুষের সঙ্গে পরিবেশের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের কাহিনি।
এই আয়োজনের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল এর ব্যাপ্তি এবং অংশগ্রহণ। প্রি-প্রাইমারি স্তরের একেবারে কচিকাঁচা পড়ুয়া থেকে শুরু করে নবম, দশম, একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রছাত্রীরা—প্রত্যেকেই নিজেদের অভিনয়, নৃত্য, সংগীত ও মঞ্চ উপস্থাপনার মাধ্যমে জীবন্ত করে তুলেছে সভ্যতার বিভিন্ন অধ্যায়। কয়েক হাজার দর্শকের সামনে একের পর এক পরিবেশনা যেন সময়ের সীমানা পেরিয়ে নিয়ে গিয়েছে দর্শকদের সুপ্রাচীন অতীতে।
শুধু ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি নয়, এই অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে উঠে এসেছে ভারতীয় জ্ঞানচর্চার গৌরবময় ঐতিহ্যও। আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির আলোয় বেড়ে ওঠা পড়ুয়াদের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা হয়েছে প্রাচীন ভারতবর্ষের জ্যোতির্বিদ্যা, দর্শন, প্রকৃতিবিজ্ঞান এবং শিক্ষাসংস্কৃতির নানা দিক। যে দেশে আর্যভট্টের মতো গণিতজ্ঞ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী জন্মেছিলেন, যে দেশের প্রাচীন শিক্ষাকেন্দ্রগুলিতে জ্ঞানচর্চার বিস্তৃত পরিসর গড়ে উঠেছিল, সেই ঐতিহ্যের সঙ্গে বর্তমান প্রজন্মের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার এক আন্তরিক প্রয়াস ছিল এই আয়োজন।
তবে 'পঞ্চতত্ত্ব'-এর বার্তা কেবল অতীতের গৌরবগাথায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। বরং অতীতের শিক্ষা থেকেই বর্তমানের সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নটির দিকে নজর ফেরানো হয়েছে—আমরা কি আমাদের পৃথিবীকে বাঁচিয়ে রাখতে পারছি?
যে পৃথিবী আমাদের আশ্রয় দেয়, যে জল ছাড়া জীবন অসম্ভব, যে বায়ুতে প্রতিটি মুহূর্তে শ্বাস নিই, যে আগুন সভ্যতার অগ্রগতির অন্যতম অনুঘটক এবং যে অসীম আকাশের দিকে তাকিয়ে মানুষ যুগ যুগ ধরে মহাবিশ্বকে জানার চেষ্টা করেছে, সেই প্রকৃতির প্রতিটি উপাদান আজ নানা সংকটের মুখে। পরিবেশ দূষণ, জলবায়ুর পরিবর্তন, জল ও বায়ুদূষণ, নির্বিচারে প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহার—সব মিলিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পৃথিবীকে বাসযোগ্য রাখার প্রশ্নটি ক্রমশ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
আসলে শিক্ষা শুধু বইয়ের পাতায় পরীক্ষার নম্বর পাওয়ার বিষয় নয়। শিক্ষা মানে নিজের শিকড়কে চেনা, ইতিহাসকে জানা, সংস্কৃতিকে উপলব্ধি করা এবং নিজের চারপাশের পৃথিবীর প্রতি দায়িত্বশীল হয়ে ওঠা। প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি নিজের সভ্যতার অতীতকে জানাও যে সমান জরুরি, জ্যোতির্ময় পাবলিক স্কুলের 'পঞ্চতত্ত্ব' যেন সেই কথাই মনে করিয়ে দিল।