দার্জিলিংয়ে মুখ্যমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ, জিটিএ-র ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন দাবি, পাহাড়ে যাচ্ছেন অর্জুন সিং—তপ্ত হচ্ছে উত্তরবঙ্গের রাজনীতি।
রঞ্জন চৌধুরী। কলকাতা সারাদিন।
পাহাড়ের রাজনীতিতে কি ফের বড় পালাবদলের ইঙ্গিত? দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকার পর আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছেন বিমল গুরুং (Bimal Gurung)। কলকাতায় এসে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক, দার্জিলিং সফরের আমন্ত্রণ এবং জিটিএ-র ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন দাবি—সব মিলিয়ে উত্তরবঙ্গের রাজনৈতিক অঙ্কে শুরু হয়েছে নতুন জল্পনা।
মঙ্গলবার সকালে কলকাতায় বিমল গুরুং (Bimal Gurung) এবং রোশন গিরি (Roshan Giri) দীর্ঘক্ষণ বৈঠক করেন মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে। প্রশাসনিক সূত্রের খবর, বৈঠকে পাহাড়ের উন্নয়ন, জিটিএ (GTA)-র কার্যকারিতা এবং ভবিষ্যৎ প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের পরিবহনমন্ত্রী অর্জুন সিং (Arjun Singh)।
সূত্রের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়ের মূল রাজনৈতিক ক্ষমতার বাইরে থাকা গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা (Gorkha Janmukti Morcha) আবারও নিজেদের সংগঠনকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে সক্রিয় হয়েছে। সেই লক্ষ্যেই রাজ্যের সঙ্গে সম্পর্ক আরও মজবুত করার কৌশল নিয়েছে মোর্চা নেতৃত্ব।
বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল আগামী ৭ অক্টোবর গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার প্রতিষ্ঠা দিবস। ওই অনুষ্ঠানে দার্জিলিং যাওয়ার জন্য মুখ্যমন্ত্রীকে আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানিয়েছেন বিমল গুরুং। মোর্চা নেতৃত্বের দাবি, মুখ্যমন্ত্রী এই আমন্ত্রণে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছেন। ফলে অক্টোবরের শুরুতেই পাহাড়ে বড় রাজনৈতিক কর্মসূচির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
তবে শুধুই সৌজন্য বৈঠক নয়, আলোচনায় উঠে এসেছে পাহাড়ের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দাবিও। বিমল গুরুং বৈঠকের পর জানান, তাঁদের লক্ষ্য শুধুমাত্র জিটিএ (GTA) চালিয়ে যাওয়া নয়, বরং পাহাড়ের জন্য একটি স্থায়ী ও কার্যকর প্রশাসনিক সমাধান। সেই বিষয়েই রাজ্যের কাছে নতুন প্রস্তাব তুলে ধরা হয়েছে।
শুধু রাজনৈতিক কাঠামো নয়, সাধারণ মানুষের সমস্যাও আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে। পাহাড়ের সরকারি স্কুলে শিক্ষক সংকট, চা-বাগানের শ্রমিকদের সমস্যা, সিঙ্কোনা বাগান (Cinchona Plantation)-এর ভবিষ্যৎ এবং কর্মসংস্থান—এই সমস্ত বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে বলে দাবি মোর্চা নেতৃত্বের।
বিমল গুরুংয়ের বক্তব্য, শিক্ষক নিয়োগ, বদলি এবং নতুন কর্মসংস্থানের বিষয়ে সরকার ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে। পাশাপাশি সিঙ্কোনা বাগান নিয়ে তাঁদের দেওয়া প্রস্তাবও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার আশ্বাস মিলেছে।
এদিকে প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে, মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে আগামী সোমবার দার্জিলিং সফরে যাচ্ছেন পরিবহনমন্ত্রী অর্জুন সিং (Arjun Singh)। সেখানে স্থানীয় সমস্যা, রাস্তার অবস্থা এবং বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের অগ্রগতি সরেজমিনে খতিয়ে দেখা হবে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট দফতরগুলির সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে।
বিমল গুরুং আরও জানান, খুব শীঘ্রই শিলিগুড়ি (Siliguri)-তে জিটিএ-র ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হবে। সেখানে পাহাড়ের তিন বিধায়ক, সাংসদ, মন্ত্রী এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধিদের নিয়ে পরবর্তী রাজনৈতিক রূপরেখা নির্ধারণ করা হতে পারে।
গোর্খাল্যান্ড প্রসঙ্গও এদিন আলোচনায় উঠে আসে। গুরুংয়ের দাবি, এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে। প্রয়োজনে ত্রিপাক্ষিক বৈঠকের মাধ্যমে সমাধানের পথ খোঁজার পক্ষেই তাঁরা।
অন্যদিকে, কলকাতা সফরে রাজনৈতিক বৈঠকের পাশাপাশি ধর্মীয় কর্মসূচিতেও অংশ নেন বিমল গুরুং। লেক কালীবাড়ি (Lake Kalibari, Kolkata)-তে পুজো দেওয়ার পর তিনি সাক্ষাৎ করেন রাজ্যের পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়নমন্ত্রী দিলীপ ঘোষ (Dilip Ghosh)-এর সঙ্গে।
সেই বৈঠকে পাহাড়ি এলাকার পঞ্চায়েতগুলির ক্ষমতা বাড়ানো, অতীতে খর্ব হওয়া অধিকার পুনর্বহাল এবং স্থানীয় প্রশাসনকে আরও কার্যকর করার দাবি জানায় গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা (Gorkha Janmukti Morcha)। পাশাপাশি পাহাড়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকির কথা তুলে ধরে প্রতিটি পঞ্চায়েতে পৃথক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা তৈরির প্রস্তাবও দেওয়া হয়।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সাম্প্রতিক এই ধারাবাহিক বৈঠক শুধুমাত্র প্রশাসনিক সৌজন্য নয়, বরং পাহাড়ের ভবিষ্যৎ রাজনীতির ইঙ্গিতও বহন করছে। সামনে বিভিন্ন রাজনৈতিক সমীকরণ বদলাতে পারে কি না, তা নিয়েও জল্পনা শুরু হয়েছে।
এখন নজর অক্টোবরের দিকে। দার্জিলিংয়ে মুখ্যমন্ত্রীর সম্ভাব্য সফর, জিটিএ-র ভবিষ্যৎ এবং পাহাড়ের নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ—সব মিলিয়ে উত্তরবঙ্গের রাজনীতিতে কি সত্যিই নতুন অধ্যায় শুরু হতে চলেছে? উত্তর মিলবে আগামী কয়েক সপ্তাহেই।