বামপন্থী শিল্পী-নাট্যকর্মীরা সাদা রং করার পরই ফের গেরুয়া রঙে রাঙানো হল টিকিট কাউন্টার, তুলিতে পাল্টা জবাব দুই বিজেপি বিধায়কের
সুহানা বিশ্বাস। কলকাতা সারাদিন।
কলকাতা: মাত্র ২৪ ঘণ্টা! মঙ্গলবার যে টিকিট কাউন্টার সাদা রঙে ফিরেছিল, বুধবার বিকেলেই সেই কাউন্টার ফের গেরুয়া। আর এই রং বদলকে ঘিরেই অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস (Academy of Fine Arts), কলকাতা চত্বরে শুরু হল নতুন রাজনৈতিক তরজা।
একদিন আগে বামপন্থী বুদ্ধিজীবী ও নাট্যকর্মীদের একাংশ উদ্যোগ নিয়ে অ্যাকাডেমির টিকিট কাউন্টারের গেরুয়া রং মুছে সাদা করে দিয়েছিলেন। তাঁদের বক্তব্য ছিল, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে রাজনৈতিক রঙের এমন সংযোগ তাঁরা মেনে নিতে পারছেন না।
কিন্তু সেই রং বেশিক্ষণ টিকল না। বুধবার বিকেলে বিজেপির দুই বিধায়ক রুদ্রনীল ঘোষ [Rudranil Ghosh] এবং সন্তু পান [Santu Pan] বিজেপি-সমর্থক নাট্যকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে ফের হাতে তুলে নিলেন তুলি। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সাদা কাউন্টার আবার গেরুয়া হয়ে গেল।
রং নিয়ে শুরু, বিতর্ক এখন রাজনীতি ঘিরে
পুরো ঘটনার সূত্রপাত ১২ জুলাই। ওই সময় অ্যাকাডেমির টিকিট কাউন্টারের রং গেরুয়া করা হয়েছিল। তারপর থেকেই বিষয়টি নিয়ে শিল্পী ও নাট্যজগতের একাংশের মধ্যে আপত্তি তৈরি হয়।
বামপন্থী নাট্য ব্যক্তিত্বদের একাংশ এই রং পরিবর্তনের প্রতিবাদে বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য [Samik Bhattacharya]-কে চিঠিও দিয়েছিলেন। তাঁদের বক্তব্য ছিল, কোনও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের পরিচিতি যেন দলীয় রাজনীতির রঙে নির্ধারিত না হয়।
সেই সময় শমীক ভট্টাচার্য জানিয়েছিলেন, যেখানে-সেখানে রং করে দেওয়া বিজেপির কর্মসূচি নয়। তাঁর বক্তব্য ছিল, এমন ঘটনা যদি দলের কেউ করে থাকেন, তা ভুল এবং বিষয়টি চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
কিন্তু বিতর্ক সেখানেই থামেনি।
সাদা করার পরেই পাল্টা গেরুয়া
মঙ্গলবার বামপন্থী বুদ্ধিজীবী ও নাট্যকর্মীদের একাংশ নিজেরাই অ্যাকাডেমির টিকিট কাউন্টার সাদা রঙে রাঙিয়ে দেন। তাঁদের দাবি ছিল, আগের গেরুয়া রং সরিয়ে সাংস্কৃতিক পরিসরের নিরপেক্ষতা বজায় রাখাই তাঁদের উদ্দেশ্য।
এর ঠিক পরের দিনই এল পাল্টা ছবি।
বুধবার শিবপুর [Shibpur]-এর বিজেপি বিধায়ক রুদ্রনীল ঘোষ এবং আরামবাগ [Arambagh]-এর বিজেপি বিধায়ক সন্তু পান অ্যাকাডেমি চত্বরে গিয়ে নিজেরাই গেরুয়া রং করেন। টিকিট কাউন্টারের ভিতর ও বাইরেও রাখা হয় ভারত মাতার ছবি।
ফলে মাত্র একদিনের ব্যবধানে অ্যাকাডেমির সেই কাউন্টার কার্যত হয়ে উঠল রাজনৈতিক প্রতীকী লড়াইয়ের কেন্দ্র।
রুদ্রনীলের বক্তব্যে আরও তীব্র হল তরজা
অ্যাকাডেমি চত্বরে দাঁড়িয়ে রুদ্রনীল ঘোষ দাবি করেন, তিনি কোনওভাবেই প্রতিষ্ঠানটির রাজনীতিকরণ চান না। তাঁর বক্তব্যের যুক্তি ছিল, অতীতে টিকিট কাউন্টারে গেরুয়া ও চকোলেট রঙের ব্যবহার ছিল।
পুরনো কিছু ছবি দেখিয়ে তাঁর দাবি, বর্তমানে যে রং নিয়ে এত বিতর্ক হচ্ছে, সেটি একেবারে নতুন কোনও বিষয় নয়।
তবে এখানেই থামেননি বিজেপি বিধায়ক। অ্যাকাডেমির ওয়ার্কিং কমিটি ও ট্রাস্টি বোর্ডের মধ্যে দ্বন্দ্ব নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন। তাঁর অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে নানা সমস্যা এবং দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে বামপন্থী মহলের আপত্তি নেই।
রুদ্রনীলের বার্তা স্পষ্ট—“যে রং ছিল, সেই রংই হবে।”
এবার নজরে রবীন্দ্রসদন-নন্দন চত্বর
অ্যাকাডেমির রং-বিতর্কের মধ্যেই আরও একটি বিষয় সামনে এসেছে। রবীন্দ্রসদন-নন্দন-শিশির মঞ্চ [Rabindra Sadan-Nandan-Shishir Mancha] চত্বরে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের [Mamata Banerjee] নাম থাকা একাধিক ফলকে গাঢ় গেরুয়া রঙের প্রলেপ দেওয়া হয়েছে বলে দাবি উঠেছে।

অন্যদিকে নন্দনের সামনে থাকা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী প্রয়াত জ্যোতি বসুর [Jyoti Basu] নামাঙ্কিত ফলকে এখনও সেই ধরনের রং করা হয়নি।
সব মিলিয়ে, একটি টিকিট কাউন্টারের রং বদলের ঘটনাই এখন কলকাতার সাংস্কৃতিক পরিসরে বৃহত্তর রাজনৈতিক বিতর্কের চেহারা নিয়েছে। শিল্প, সংস্কৃতি ও রাজনীতি—এই তিনের সীমারেখা কোথায়, সেই প্রশ্নই ফের সামনে।
আজ গেরুয়া, কাল সাদা, আবার গেরুয়া—অ্যাকাডেমির এই রং-যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে থামবে?