ধর্ম নয়, আদালতের নির্দেশই মানছে প্রশাসন—দাবি মুখ্যমন্ত্রীর। মসজিদে মাইক অপসারণ নিয়ে রাজনৈতিক চাপানউতোরের মাঝেই সামনে এল সরকারি পরিসংখ্যান।
সুষমা পাল মন্ডল। কলকাতা সারাদিন।
মসজিদের লাউডস্পিকার অপসারণ ঘিরে যখন রাজ্য রাজনীতি তপ্ত, ঠিক সেই সময়েই বিতর্কের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে স্পষ্ট বার্তা দিলেন মুখ্যমন্ত্রী। প্রশ্নটা তিনি উল্টেই ছুড়ে দিলেন—“বারবার শুধু মসজিদের কথাই বলা হচ্ছে কেন? মন্দিরের নাম কেন বলা হচ্ছে না?” এই এক মন্তব্যেই নতুন করে চর্চার ঝড় উঠেছে রাজনৈতিক মহলে।
নবান্নে (Nabanna) মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মুখ্যমন্ত্রী (Suvendu Adhikari) স্পষ্ট জানিয়ে দেন, রাজ্য সরকার কোনও নতুন আইন কার্যকর করেনি। প্রশাসন শুধুমাত্র ২০২০ সালের কলকাতা হাইকোর্টের (Calcutta High Court) নির্দেশ মেনেই কাজ করছে। তাই কোনও একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়কে আলাদা করে লক্ষ্য করার অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলেই দাবি তাঁর।
গত কয়েকদিন ধরে রাজ্যের একাধিক জেলায় মসজিদ থেকে লাউডস্পিকার সরানো নিয়ে বিতর্ক দানা বাঁধে। অভিযোগ ওঠে, অনেক জায়গায় নাকি আগাম নোটিস ছাড়াই মাইক খুলে নেওয়া হচ্ছে। এই ইস্যুতে সরব হন নওশাদ সিদ্দিকি (Naushad Siddique)। অন্যদিকে আবু তাহের, খলিলুর রহমান এবং ইউসুফ পাঠানও (Abu Taher, Khalilur Rahman, Yusuf Pathan) বিষয়টি নিয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন বলে জানা যায়।
এই আবহেই মুখ্যমন্ত্রী পরিষ্কার ভাষায় বলেন, আদালতের নির্দেশে কোথাও শুধু মসজিদের কথা লেখা নেই। নির্দেশে বলা হয়েছে, যে কোনও ধর্মীয় স্থান—মন্দির হোক বা মসজিদ—নির্ধারিত শব্দসীমা মেনে চলতেই হবে। সেই নির্দেশ বাস্তবায়ন করতেই রাজ্য পুলিশ পদক্ষেপ করছে।
বিতর্কের মাঝেই মুখ্যমন্ত্রী এমন একটি পরিসংখ্যান সামনে আনেন, যা নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। তাঁর দাবি, এখন পর্যন্ত রাজ্যে ৪২০৩টি মসজিদ থেকে লাউডস্পিকার সরানো হয়েছে। একই সঙ্গে ১০৯৬টি মন্দির থেকেও লাউডস্পিকার অপসারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ বুধবার পর্যন্ত ৩৪টি পুলিশ জেলা মিলিয়ে মোট ৫২৯৯টি লাউডস্পিকারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
এই সংখ্যাগুলি তুলে ধরে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, প্রশাসনের পদক্ষেপ কোনওভাবেই ধর্মভিত্তিক নয়। বরং আদালতের নির্দেশ কার্যকর করাই একমাত্র উদ্দেশ্য। তাই শুধুমাত্র মসজিদকে সামনে এনে বিতর্ক তৈরি করার চেষ্টা বাস্তব ছবিকে আড়াল করছে বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবি ছিল আরেকটি। মুখ্যমন্ত্রী জানান, এখনও পর্যন্ত কোনও মন্দির বা মসজিদে বলপ্রয়োগ করতে হয়নি। প্রশাসন আদালতের নির্দেশের কথা জানাতেই অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ স্বেচ্ছায় লাউডস্পিকার খুলে দিয়েছেন। ফলে আইন-শৃঙ্খলার কোনও বড় সমস্যা তৈরি হয়নি বলেও দাবি তাঁর।
তবে রাজনৈতিক বিতর্ক এখানেই থেমে নেই। বিরোধী মহলের একাংশ প্রশ্ন তুলছে, প্রশাসনের এই অভিযান কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে এবং সব জায়গায় একই নিয়ম মেনে কাজ হচ্ছে কি না। অন্যদিকে সরকার বারবার বলছে, শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে আদালতের নির্দেশ কার্যকর করা ছাড়া তাদের অন্য কোনও উদ্দেশ্য নেই।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, ধর্মীয় আবেগ জড়িয়ে থাকা এই ধরনের ইস্যু নির্বাচনের আগে আরও বড় রাজনৈতিক বিতর্কে পরিণত হতে পারে। কারণ একদিকে আইন মেনে প্রশাসনিক পদক্ষেপের প্রশ্ন, অন্যদিকে ধর্মীয় অনুভূতি—এই দুইয়ের ভারসাম্য বজায় রাখাই এখন সরকারের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

এখন নজর একটাই—এই বিতর্ক কি আদালতের নির্দেশ কার্যকরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি আগামী দিনে রাজ্যের রাজনীতিতে আরও বড় সংঘাতের নতুন ইস্যু হয়ে উঠবে? সেই উত্তরই এখন খুঁজছে বাংলা।