মাত্র ১৮ ঘণ্টার ব্যবধানে গাইঘাটা ও ধুলিয়ানে পুলিশের গুলিতে মৃত্যু হল দুই অভিযুক্তের। আর একই দিনে দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরে পুলিশ হেফাজতে থাকা এক ব্যক্তির অস্বাভাবিক মৃত্যুর অভিযোগ ঘিরে তৈরি হল নতুন বিতর্ক। পরপর তিনটি ঘটনায় রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা, পুলিশি অভিযান এবং হেফাজতে থাকা ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে (West Bengal encounter and custody death)। গাইঘাটায় নাবালিকা ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় ধৃত প্রহ্লাদ দাস এবং ধুলিয়ানে বিজেপি নেতা সুজিত মণ্ডল খুনের মামলায় অভিযুক্ত শামিউলের মৃত্যু হয়েছে পুলিশের গুলিতে। দুই ক্ষেত্রেই পুলিশ ও সিআইডির দাবি, অভিযুক্তেরা আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে পালানোর চেষ্টা করেছিল। আত্মরক্ষার্থেই গুলি চালানো হয়। অন্যদিকে, বারুইপুরে ভুয়ো চিকিৎসক সন্দেহে ধৃত বাসুদেব নস্করের মৃত্যুকে ঘিরে তাঁর পরিবারের তরফে উঠেছে গুরুতর অভিযোগ। গাইঘাটায় কীভাবে মৃত্যু প্রহ্লাদের? পুলিশ সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গাইঘাটা থানা এলাকায় এক নাবালিকার ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে গ্রেফতার করা হয়েছিল প্রহ্লাদ দাসকে। নিহত ছাত্রীর সঙ্গে তাঁর পারিবারিক সম্পর্ক ছিল বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। শনিবার রাতে পরিবারের সঙ্গে একটি বিজয়া সম্মিলনীর অনুষ্ঠানে গিয়েছিল ওই ছাত্রী। রাত সাড়ে ১১টা নাগাদ একটি ফোন পেয়ে সে অনুষ্ঠানস্থল থেকে বেরিয়ে যায়। তার পর থেকে খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। রবিবার সকালে প্রতিবেশী একটি পরিবারের শৌচাগারের সামনে তার দেহ উদ্ধার হয়। পরিবারের অভিযোগ, ধর্ষণের পর কুপিয়ে খুন করা হয়েছে তাকে। পুলিশের দাবি, সোমবার গভীর রাতে ঘটনার পুনর্নির্মাণের জন্য প্রহ্লাদকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। ফেরার পথে বৈদ্যপুরের কাছে প্রস্রাব করার কথা বলে সে গাড়ি থামাতে বলে। এরপর এক পুলিশকর্মীর সার্ভিস রিভলভার ছিনিয়ে নিয়ে গুলি চালিয়ে পালানোর চেষ্টা করে বলে অভিযোগ। পুলিশের বক্তব্য, প্রহ্লাদ চার রাউন্ড গুলি চালায়। পাল্টা গুলি চালায় পুলিশও। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাকে চাঁদপাড়া হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন। পুলিশের দাবি, অভিযুক্তকে আত্মসমর্পণের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। তবে গোটা ঘটনার স্বাধীন তদন্তের ফল কী, তা এখনও স্পষ্ট নয়। এনকাউন্টার ঘিরে উঠছে একাধিক প্রশ্ন পুলিশের উপর গুলি চালানো হলে আত্মরক্ষার জন্য পাল্টা গুলি চালানোর যুক্তি থাকতেই পারে। কিন্তু গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত একজন ব্যক্তি পুলিশি হেফাজতে থাকা অবস্থায় কীভাবে আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে পালানোর সুযোগ পেলেন, সেই প্রশ্নও উঠছে। প্রহ্লাদের হাতে হাতকড়া ছিল কি না, থাকলে কীভাবে তিনি অস্ত্র ছিনিয়ে নিলেন, রাতের অন্ধকারে নির্জন জায়গায় গাড়ি থামানোর সিদ্ধান্ত কেন নেওয়া হয়েছিল—এমন একাধিক বিষয় খতিয়ে দেখা জরুরি। পুলিশের তরফে এখনও সব প্রশ্নের বিস্তারিত সরকারি ব্যাখ্যা সামনে আসেনি। নিহত নাবালিকার বাবা পুলিশের পদক্ষেপে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। তবে প্রহ্লাদের পরিবার তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছে। তদন্তের চূড়ান্ত ফল সামনে আসার আগেই তাঁর অপরাধ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় না বলেই পরিবারের বক্তব্য। ধুলিয়ানে সিআইডির গুলিতে মৃত্যু শামিউলের গাইঘাটার ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মুর্শিদাবাদের ধুলিয়ানে পুলিশের গুলিতে মৃত্যু হয় শামিউলের। তিনি বিজেপি নেতা সুজিত মণ্ডল খুনের মামলায় প্রধান অভিযুক্ত ছিলেন বলে তদন্তকারীদের দাবি। সিআইডি সূত্রে জানা গিয়েছে, মঙ্গলবার তদন্তের প্রয়োজনে শামিউলকে ধুলিয়ান বাজারের ডাকবাংলো মোড় এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেই সময় এক পুলিশকর্মীর আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে গুলি চালিয়ে পালানোর চেষ্টা করেন তিনি বলে অভিযোগ। পাল্টা গুলি চালান এক সিআইডি আধিকারিক। গুলিবিদ্ধ শামিউলকে অনুপনগর ব্লক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন। সিআইডির দাবি, পরিকল্পনা করেই অস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল এবং তদন্তকারীদের উপর হামলার উদ্দেশ্য ছিল অভিযুক্তের। তবে এই ঘটনারও পূর্ণাঙ্গ বিবরণ এবং পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সামনে আসা প্রয়োজন। কীভাবে খুন হয়েছিলেন বিজেপি নেতা সুজিত মণ্ডল? প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের সেপ্টেম্বরের গোড়ায় ফারাক্কা ব্যারাজ থেকে উদ্ধার হওয়া দেহাংশের সূত্র ধরে বিজেপি নেতা সুজিত মণ্ডলের হত্যাকাণ্ডের তদন্ত শুরু হয়। পরে দেহাংশটি তাঁর বলে শনাক্ত করা হয়। তদন্তকারীদের দাবি, এক মহিলাকে কেন্দ্র করে ব্যক্তিগত সম্পর্কের টানাপোড়েন থেকেই খুনের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। ওই মহিলা এবং শামিউল এই ঘটনায় জড়িত বলে তদন্তে উঠে এসেছে বলে সিআইডি সূত্রের দাবি। তবে এই অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা বিচারপ্রক্রিয়া ও তদন্তের ফলের উপর নির্ভরশীল। বারুইপুরে বাসুদেব নস্করের মৃত্যু, পরিবারের অভিযোগ দুই এনকাউন্টারের দিনেই বারুইপুরে পুলিশ হেফাজতে থাকা বাসুদেব নস্করের অস্বাভাবিক মৃত্যুর খবর সামনে আসে। ভুয়ো চিকিৎসক পরিচয়ে চিকিৎসা করার অভিযোগে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। তাঁর ডিগ্রি ভুয়ো এবং নাম ভাঁড়িয়ে চিকিৎসা করতেন বলে পুলিশের অভিযোগ। বাসুদেবের স্ত্রী সোনালির দাবি, মঙ্গলবার পুলিশ তাঁকে স্বামীর অসুস্থতার খবর দেয়। হাসপাতালে গিয়ে তিনি দেখেন, বাসুদেবের হাত-পা বাঁধা অবস্থায় রয়েছে। স্বামীর অসুস্থতা এবং তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করার কারণ জানতে চাইলেও স্পষ্ট উত্তর পাননি বলে অভিযোগ তাঁর। পরে তিনি জানতে পারেন, বাসুদেবের মৃত্যু হয়েছে। সোনালির অভিযোগ, তাঁর স্বামীর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ আড়াল করা হচ্ছে এবং মৃত্যুর পিছনে রহস্য রয়েছে। যদিও পুলিশ সূত্রের বক্তব্য, জেলে আচমকা অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাঁকে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছিল। ছটফট করছিলেন বলে তাঁর হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছিল বলেও পুলিশের দাবি। পুলিশ জানিয়েছে, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পাওয়ার পরই মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে। তিনটি মৃত্যু, তিনটি আলাদা তদন্ত। পুলিশের দাবি, গাইঘাটা ও ধুলিয়ানে আত্মরক্ষার্থে গুলি চালানো হয়েছিল। অন্যদিকে, বারুইপুরের ঘটনায় মৃত্যুর কারণ এখনও ময়নাতদন্তের রিপোর্টের অপেক্ষায়। প্রতিটি ক্ষেত্রেই অভিযোগ, পুলিশের বক্তব্য এবং তদন্তের ফল আলাদা করে যাচাই করা জরুরি। হেফাজতে মৃত্যু ও এনকাউন্টারের মতো ঘটনায় স্বচ্ছ তদন্তই প্রকৃত ঘটনা সামনে আনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।
Encounter: ১৮ ঘণ্টায় জোড়া এনকাউন্টার, বারুইপুরে পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু! একদিনে তিন মৃত্যু ঘিরে বাংলায় তোলপাড়
১৮ ঘণ্টায় জোড়া এনকাউন্টার, বারুইপুরে পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু! একদিনে তিন মৃত্যু ঘিরে বাংলায় তোলপাড়
👁 এই সংবাদটি পড়েছেন ০ জন পাঠক