সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের আগে বাংলার রাজনীতিতে নতুন করে উত্তাপ ছড়াল ধর্মতলার মঞ্চ। তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় শুক্রবার সেখান থেকেই সরাসরি বিজেপিকে “সামাজিক ভাবে বয়কট” করার ডাক দিলেন। তাঁর বক্তব্য, “নো ভোট টু বিজেপি” স্লোগান আর যথেষ্ট নয়— এবার বিজেপিকে সামাজিক ভাবে বিচ্ছিন্ন করার সময় এসেছে।
ধর্মতলায় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডাকা অবস্থান কর্মসূচির মঞ্চ থেকেই অভিষেকের এই তীব্র রাজনৈতিক বার্তা স্পষ্ট করে দিল, আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনকে ঘিরে তৃণমূল বিজেপির বিরুদ্ধে আরও আক্রমণাত্মক রাজনৈতিক অবস্থান নিতে চলেছে।
ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে উত্তেজনা
রাজ্য রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে ভোটার তালিকা সংশোধনের বিশেষ প্রক্রিয়া— স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা এসআইআর। তৃণমূলের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ার নামে বাংলায় ব্যাপক হারে ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে।
ধর্মতলার মঞ্চে দাঁড়িয়ে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন,
“২০২১ সালে কিছু সামাজিক সংগঠন বলেছিল নো ভোট টু বিজেপি। নো ভোট টু বিজেপি। আমরা এই মঞ্চে ১০ কোটি বঙ্গবাসীকে সাক্ষী রেখে বলছি, এ বার বিজেপিকে বয়কট করতে হবে। বিজেপিকে সামাজিক ভাবে বয়কট করুন।”
তাঁর দাবি, ইতিমধ্যেই বাংলার প্রায় ৬৪ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ পড়েছে এবং আরও প্রায় ৬০ লক্ষ মানুষের নাম ‘বিবেচনাধীন’ অবস্থায় রয়েছে। সব মিলিয়ে এই সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ২০ লক্ষের কাছাকাছি পৌঁছেছে বলে দাবি করেন তিনি।
অভিষেকের বক্তব্য,
“ইতিমধ্যে বাংলা থেকে ৫৮ লক্ষ ভোটারের নাম কাটা হয়েছিল। খসড়া তালিকা সেটা। তার পর ২৮ ফেব্রুয়ারি দেখা গেল সংখ্যাটা ৬৩-৫৪ লক্ষ। বিবেচনাধীন সংখ্যা ৬০ লক্ষের বেশি। সবমিলিয়ে ১ কোটি ২০ লক্ষ।”
“এই লড়াই ভোটাধিকার রক্ষার”
তৃণমূল নেতৃত্বের অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে বাংলার মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার পরিকল্পনা চলছে। অভিষেকের কথায়,
“চুরি করে ভোটে জেতার জন্য লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির নামে ১ কোটি মানুষের নাম বাদ দেওয়ার ষড়যন্ত্র করেছিল। ধরে ফেলেছেন বিএলএ-২-রা।”
তিনি আরও বলেন, এই লড়াই শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে নয়, বরং বাংলার মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার লড়াই।
অভিষেকের বক্তব্য,
“আমাদের প্রাপ্য টাকা আটকেছিল। এবার ভোটাধিকার কেড়ে নিতে চায়।”
নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে তৃণমূলের অভিযোগ
এই ইস্যুতে সরাসরি নির্বাচন কমিশনের ভূমিকাও প্রশ্নের মুখে তুলেছেন তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্ব। অভিষেকের অভিযোগ, বিজেপি আগেও কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলিকে ব্যবহার করেছে এবং এবার নির্বাচন কমিশনকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার চেষ্টা চলছে।
তিনি বলেন,
“এতদিন বিজেপি তার শাখা সংগঠন ইডি, সিবিআই, আইটিকে তৃণমূলের বিরুদ্ধে মাঠে নামিয়েছিল। এবার বাংলা দখল করতে নয়া সংস্থা কমিশনকে ময়দানে নামিয়েছে। যাতে বাংলার মানুষ ভোট দিতে না পারে।”
এই বক্তব্য স্পষ্ট করে দিচ্ছে, ভোটার তালিকা ইস্যুকে সামনে রেখে আগামী দিনে তৃণমূল বিজেপির বিরুদ্ধে আরও তীব্র রাজনৈতিক প্রচার চালাতে পারে।
মুখ্যমন্ত্রীর আইনি লড়াইয়ের প্রসঙ্গ
ধর্মতলার মঞ্চে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকাও তুলে ধরেন অভিষেক। তাঁর দাবি, সাধারণ নাগরিকের মতো সুপ্রিম কোর্টে মামলা করে লড়াই করার নজির খুব কমই রয়েছে।
অভিষেক বলেন,
“আমাদের মুখ্যমন্ত্রীই একমাত্র নেত্রী যিনি সাধারণ নাগরিক হিসাবে সুপ্রিম কোর্টে মামলা করে লড়তে গিয়েছেন। আর কোনও রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে দেশের মানুষ সওয়াল করতে দেখেননি।”
বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলির প্রসঙ্গ
অভিষেক তাঁর বক্তব্যে বিজেপি শাসিত একাধিক রাজ্যের প্রসঙ্গও তোলেন। তিনি দাবি করেন, বাংলার সামাজিক প্রকল্পগুলির মতো উদ্যোগ সেখানে নেই।
লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন,
“কোনও শর্ত ছাড়া আড়াই কোটি মহিলাকে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার দিয়েছে। মোদীর একটা সরকার দিয়ে দেখাক! যদি দিতে পারে আমি রাজনীতি থেকে অবসর নেব।”
এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তৃণমূলের রাজনৈতিক কৌশলও পরিষ্কার— সামাজিক প্রকল্পগুলিকে সামনে রেখে বিজেপির বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করা।
সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় বিতর্কেও মন্তব্য
সম্প্রতি প্রাক্তন ভারত অধিনায়ক সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়কে ঘিরে যে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে, সেই প্রসঙ্গেও মন্তব্য করেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।
তিনি বলেন,
“সৌরভ গাঙ্গুলি যদি দালাল হন, ২০২১ সালে শুভেন্দু অধিকারী, দিলীপ ঘোষদের বগলদাবা করে বেহালায় তাঁর বাড়িতে গিয়ে লুচি-আলুর দম খেয়ে এসেছিলেন কেন অমিত শাহ? বাঙালি তো, তাই উনি মাথা নত করেননি।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, ধর্মতলার এই মঞ্চ থেকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের “বয়কট বিজেপি”র ডাক আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের আগে তৃণমূলের রাজনৈতিক কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।
২০২১ সালের নির্বাচনে “বাংলা নিজের মেয়েকেই চায়” স্লোগানকে সামনে রেখে তৃণমূল যে আবেগঘন রাজনৈতিক প্রচার গড়ে তুলেছিল, এবারও তেমনই এক আবেগনির্ভর রাজনৈতিক বয়ান তৈরির চেষ্টা শুরু হয়েছে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
ভোটার তালিকা সংশোধন, কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাত এবং সামাজিক প্রকল্প— এই তিনটি ইস্যুকে সামনে রেখে আগামী দিনে বাংলার রাজনৈতিক লড়াই আরও তীব্র হতে পারে বলেই মনে করা হচ্ছে।
ধর্মতলার মঞ্চ থেকে অভিষেকের এই আক্রমণাত্মক বার্তা সেই সংঘাতেরই স্পষ্ট ইঙ্গিত।