সুহানা বিশ্বাস। কলকাতা সারাদিন।
মুর্শিদাবাদ: শোক, কান্না আর স্তব্ধতা এখনও কাটেনি। কয়েক দিন আগে গোবিন্দপুর রেলগেট (Gobindapur Rail Gate, Murshidabad)-এ ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক ট্রেন–পুলকার সংঘর্ষের ক্ষত এখনও তাজা। সেই আবহেই শুক্রবার সকালে ঘটনাস্থলে পৌঁছে স্বজনহারাদের সামনে দাঁড়িয়ে আবেগঘন বার্তার পাশাপাশি কঠোর প্রশাসনিক অবস্থানও স্পষ্ট করে দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)।
পরিবারগুলোর সঙ্গে একান্তে কথা বলার পর মুখ্যমন্ত্রীর কণ্ঠে ছিল শোক, আবার একই সঙ্গে ছিল কঠোর সতর্কবার্তা। তিনি বলেন, “দোষীর চূড়ান্ত শাস্তি হবে। এটা ক্ষমার অযোগ্য। আমি পরিবারগুলোর পাশে আছি এবং থাকব।” তাঁর এই মন্তব্য ঘিরে নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে দুর্ঘটনার তদন্ত ও দায় নির্ধারণের বিষয়টি।
গত ১৭ জুলাই গোবিন্দপুর রেলগেটে একটি ট্রেনের সঙ্গে স্কুলপড়ুয়াদের বহনকারী একটি পুলকারের সংঘর্ষে চার পড়ুয়া ও এক প্রাপ্তবয়স্কের মৃত্যু হয়। একাধিক ব্যক্তি আহত হন। দুর্ঘটনার পর থেকেই এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে।
শুক্রবার সকালে বহরমপুর (Berhampore, Murshidabad)-এ হেলিকপ্টারে পৌঁছে মুখ্যমন্ত্রী সরাসরি সভামঞ্চে না গিয়ে প্রথমে দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর বাড়িতে যান। তাঁদের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথা বলেন, সমবেদনা জানান এবং সরকারের পক্ষ থেকে পাশে থাকার আশ্বাস দেন।
এরপর রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে নিহতদের প্রত্যেক পরিবারের হাতে ৫ লক্ষ টাকা এবং আহতদের পরিবারকে ১ লক্ষ টাকা করে আর্থিক সহায়তা তুলে দেওয়া হয়। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, অর্থ দিয়ে এই ক্ষতি পূরণ করা সম্ভব নয়, তবুও সরকারের দায়িত্ব থেকে যা করার, তা করা হবে।

আবেগঘন ভাষণে তিনি বলেন, “এই শোকের মুহূর্তে চোখের জল ছাড়া আমার ব্যক্তিগতভাবে দেওয়ার কিছু নেই। তবে পরিবারগুলোর যে প্রয়োজনের কথা শুনেছি, তা পূরণে সরকার যথাসাধ্য চেষ্টা করবে।”
দুর্ঘটনার প্রাথমিক তদন্তের রিপোর্টের প্রসঙ্গ তুলে মুখ্যমন্ত্রী জানান, রেল ও পুলিশ প্রশাসনের কাছ থেকে তিনি যে প্রাথমিক তথ্য পেয়েছেন, তাতে গেটম্যানের দায়িত্ব পালনে গাফিলতির বিষয়টি উঠে এসেছে। যদিও তদন্ত এখনও সম্পূর্ণ হয়নি, তবুও দোষ প্রমাণিত হলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেই তিনি স্পষ্ট করেন।
শুভেন্দু অধিকারী (West Bengal Chief Minister) বলেন, “আমি পুলিশকে স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছি, অভিযুক্ত জেলে থাকাকালীন তদন্ত দ্রুত শেষ করতে হবে। সময়মতো চার্জশিট জমা দিতে হবে এবং আইনের সর্বোচ্চ বিধান অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য যা যা প্রয়োজন, তা করতে হবে।”
এদিন শুধু ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সঙ্গে দেখা করাই নয়, প্রশাসনের শীর্ষ আধিকারিক, রেল কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট কর্মীদের সঙ্গেও বৈঠক করেন মুখ্যমন্ত্রী। কীভাবে ভবিষ্যতে এই ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো যায়, কোথায় কোথায় নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি রয়েছে এবং কীভাবে রেলগেটগুলিতে অতিরিক্ত সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায়, তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
বিশেষ করে কর্ণসুবর্ণ রেলগেট (Karnasubarna Rail Gate)-সহ ঝুঁকিপূর্ণ লেভেল ক্রসিংগুলিতে নিরাপত্তা বাড়ানোর ওপর জোর দেন তিনি। প্রয়োজনে বিষয়টি নিয়ে রেলমন্ত্রী (Railway Ministry)-র সঙ্গেও কথা বলবেন বলে আশ্বাস দেন।
মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, শুধু প্রশাসনের নজরদারিই যথেষ্ট নয়, সমাজকেও এগিয়ে আসতে হবে। তিনি গ্রামবাসীদের উদ্দেশে আবেদন করেন, দুর্ঘটনায় স্বজন হারানো পরিবারগুলোর পাশে যেন সকলে থাকেন। তাঁর কথায়, “এই পরিবারগুলো যাতে কোনওভাবেই নিজেদের একা মনে না করে, সেটা নিশ্চিত করা আমাদের সবার দায়িত্ব।”
জেলাশাসক ও পুলিশ সুপারকেও তিনি আলাদা করে দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছেন বলে জানান। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের নিয়মিতভাবে পরিবারগুলোর খোঁজ রাখার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
গোবিন্দপুরের এই দুর্ঘটনা রাজ্যে রেল নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে। প্রশাসনিক মহলের মতে, তদন্তের চূড়ান্ত রিপোর্ট সামনে এলে দায় নির্ধারণ আরও স্পষ্ট হবে। সেই রিপোর্টের ভিত্তিতেই পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এখন প্রশ্ন একটাই—তদন্ত কত দ্রুত শেষ হবে, আর মুখ্যমন্ত্রী যে ‘চূড়ান্ত শাস্তি’-র বার্তা দিলেন, তার প্রতিফলন কি আদালতের প্রক্রিয়ায় দেখা যাবে? মুর্শিদাবাদের এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার বিচার কোন পথে এগোয়, সেদিকেই এখন নজর গোটা রাজ্যের।