সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
ভারতবর্ষে জাতীয় নির্বাচন কমিশনের ইতিহাসে নজিরবিহীন রায় দিল সুপ্রিম কোর্ট। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবিকে মান্যতা দিয়ে বাংলায় এসআইআর প্রক্রিয়া আদালতের তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন করার জন্য নির্দেশ দিল। সুপ্রিমকোর্ট। তবে এর পাশাপাশি জাতীয় নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে অসহযোগিতা করার জন্য রাজ্য প্রশাসনকে তীব্র ভর্ৎসনা করলেন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি।
পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর নিয়ে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তা ব্যাতিক্রমী বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান বিচারপতি। পাশাপাশি রাজ্যে এবার বিচারকদের তত্ত্বাবধানে এসআইআর প্রক্রিয়া চলবে বলেও জানিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হবে বলেও জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে এবার জুড়িশিয়াল অফিসারেরা শেষ সিদ্ধান্ত নেবেন। আর জুডিশিয়াল অফিসার নিয়োগ করার জন্য এসব সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি দায়িত্ব দিলেন কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির উপরে।
শুক্রবার ফের বাংলার এসআইআর মামলার শুনানি হয়েছে শীর্ষ আদালতে। শুনানির প্রথমেই রাজ্যের আইনজীবী কপিল সিব্বল আদালতে জানান, তালিকা প্রকাশ করা হচ্ছে না। তালিকা প্রকাশের কাজ থমকে গিয়েছে। আদালতের নির্দেশের পর গত ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে নথি আপলোডের কাজ থামিয়ে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। পাল্টা কমিশন জানায়, এসআইআরের কাজে সাহায্যের জন্য আরও গ্রুপ-বি কর্মী চেয়ে রাজ্যকে চিঠি দিয়েছিল তারা। কিন্তু জবাবে সরকার জানিয়েছে, কমিশনের আবেদন ‘বিবেচনাধীন।’ এরপরেই রাজ্যের ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত। তিনি বলেন, আদালতের নির্দেশের পর রাজ্য সহযোগিতা করবে বলে তিনি আশা করেছিলেন। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। একই সঙ্গে কমিশন এসআইআরের কাজের জন্য নিজেদের আধিকারিক নিয়ে আসতে পারবে, জানিয়েছেন প্রধান বিচারপতি। রাজ্যের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আমরা দুটো পরিস্থিতি বুঝতে পারছি। হয় আপনাদের পর্যাপ্ত সংখ্যক গ্রুপ-বি কর্মী নেই, যা একটা আইনি বাধ্যবাধকতা। নয়তো আপনারা তাঁদের ছাড়তে পারছেন না। সে ক্ষেত্রে ইআরও বা এইআরও-র কাজের জন্য কমিশন কর্মী আনতে পারবে।’
প্রধান বিচারপতি আরও বলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গ সরকার এসআইআর নিয়ে এমন পরিস্থিতি তৈরি করছে, যেখানে বিচারবিভাগীয় হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।’ অন্যদিকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আইনজীবী শ্যাম দিওয়ান বলেন, ‘কমিশন বিশেষ পর্যেবক্ষক নামের এক নতুন ধরনের অফিসার নিয়োগ করেছেন। তাঁরা ইআরওদের কাজে হস্তক্ষেপ করছেন। ইআরও-দের সিদ্ধান্ত খারিজ করে দিচ্ছেন। তাঁরাই ফাইল যাচাই করে ইআরওদের কাছে ফেরত পাঠিয়ে দিচ্ছেন। এবার ইআরওরা কী করবেন?’ জবাবে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, এসআইআরের প্রথম পর্ব থেকেই বিশেষ পর্যেবক্ষকেরা রয়েছেন। শুক্রবার শীর্ষ আদালতে খসড়া তালিকা নিয়ে অভিযোগ বা কোনও দাবি জানানোর জন্য আরও সময় দিতে বলেন রাজ্যের আইনজীবী। ৪৮ ঘণ্টা বাড়তি সময় চেয়েছেন তিনি।
প্রধান বিচারপতি জানান, এসআইআরের কাজ সম্পূর্ণ না হলে গুরুতর সমস্যা হবে। তা কমিশন এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকার উভয়ের বোঝা উচিত। তাঁর কথায়, ‘এই রাজ্যে এসআইআর শেষ করতে হয় বিচারবিভাগীয় আধিকারিক বা প্রাক্তন বিচারপতিদের আনতে হবে, অথবা অন্য রাজ্য থেকে আইএএস অফিসারদের নিয়োগ করতে হবে।’ এর প্রেক্ষিতে রাজ্যের আইনজীবী জানান, বিচারবিভাগীয় আধিকারিক আনা হলে রাজ্যের তাতে কোনও আপত্তি নেই। কিন্তু বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী জানান, সে ক্ষেত্রে বাংলা নামের বানান বোঝা নিয়ে যে সমস্যা তৈরি হয়েছে, তা মিটে যাবে। তাঁর পর্যবেক্ষণ, কমিশন এবং রাজ্য উভয় তরফেই দ্বিধা রয়েছে। তাদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে। বিচারবিভাগীয় আধিকারিক নিয়োগ করে এসআইআরের কাজ করানোর বিষয়ে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সহমত বিচারপতি বাগচী। অন্যদিকে প্রধান বিচারপতির পর্যবেক্ষণ, এসআইআরের কাজের জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকার উপযুক্ত আধিকারিক দিচ্ছে না। এতে জনগণ সমস্যায় পড়বেন।
এদিন আদালতে কমিশন জানিয়েছে, নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যে সমস্ত নাম পাওয়া যাবে, তা দিয়েই চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করবে তারা। প্রয়োজনে পরে অতিরিক্ত তালিকা প্রকাশ করে নাম যোগ করা যেতে পারে। এরপরেই সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, ২৮ তারিখের মধ্যেই চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করতে হবে। প্রয়োজনে পরে অতিরিক্ত তালিকা প্রকাশ করে নাম যোগ করা যেতে পারে। আপাতত যা হয়েছে, তা-ই প্রকাশ করতে হবে। তবে রাজ্যের আইনজীবী এই নির্দেশ না-দেওয়ার অনুরোধ করেন। তিনি জানান, এতে রাজ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। কিন্তু শীর্ষ আদালত আপত্তি শোনেনি। আদালত জানিয়েছে, বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের এই কাজে বেশি দিন নিযুক্ত রাখা যাবে না। পাশাপাশি, এসআইআরকে কেন্দ্র করে রাজ্যে ছোটখাটো যে সমস্ত হিংসার ঘটনা ঘটেছে, তা নিয়ে স্টেটাস রিপোর্ট তলব করেছে সুপ্রিম কোর্ট।
সুপ্রিম কোর্টের রায়কে স্বাগত জানিয়েছেন তৃণমূলের আইনজীবী সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেছেন, এবার সুপ্রিম কোর্টের রায়ে ইতিহাস তৈরি হয়েছে। এবার থেকে নির্বাচন কমিশন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে না। বিচারকরাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। তবে এবার সুপ্রিম কোর্ট বলেছে, এসআইআর না হলে সমস্যা হবে। ভোট হতে পারবে না। কমিশনকেও এই বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল সুপ্রিম কোর্ট। এসআইআর নিয়ে রাজ্যে যে হিংসা হয়েছে তারও রিপোর্ট তলব করেছে সুপ্রিম কোর্ট।