সুহানা বিশ্বাস। কলকাতা সারাদিন।
আশঙ্কা ছিল আগে থেকেই। আশঙ্কা ছিল ২০১৬ সালের স্কুল সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষায় চাকরি পাওয়া ২৬ হাজার শিক্ষক শিক্ষিকা এবং শিক্ষা কর্মীর চাকরি যেভাবে ছাঁটাই হয়েছে ঠিক সেভাবেই হয়তো বা ২০১৪ সালের প্রাথমিকে চাকরি পাওয়া শিক্ষক শিক্ষিকাদের চাকরি বাতিল হতে পারে। কলকাতা হাইকোর্টের ঘোষণা করার রায়ে প্রাথমিকে ৩২ হাজার শিক্ষক-শিক্ষিকার চাকরি বহাল রইল। অর্থাৎ ডিভিশন বেঞ্চে চাকরি বাতিলের রায় খারিজ হয়ে গেল কলকাতা হাইকোর্ট। জানিয়েছে, দীর্ঘ ন’বছর চাকরি বাতিল করলে, শিক্ষক-শিক্ষিকা ও তাঁদের পরিবারের উপর বিরূপ প্রভাব পড়বে। তাই ৩২ হাজার চাকরি বহাল থাকছে। আর কলকাতা হাইকোর্ট এই রায় দেওয়ার পরে তাকে স্বাগত জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কলকাতা হাইতোর্টের প্রাক্তন বিচারপিত অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ই প্রথম ৩২০০০ চাকরি বাতিলের নির্দেশ দেন। পরিবর্তে তিন মাসের মধ্যে নতুন করে নিয়োগ সম্পূর্ণ করতে নির্দেশ দেন তিনি।
কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তী এবং বিচারপতি ঋতব্রতকুমার মিত্রের ডিভিশন বেঞ্চ বুধবার জানায়, সকলের চাকরি বহাল থাকছে। দুর্নীতির মামলার তদন্ত যেমন চলছে। কিন্তু তার প্রভাব যেন চাকরিরতদের উপর না পড়ে। আদালত জানিয়েছে, দুর্নীতি হয়েছে বলেই সকলের চাকরি বাতিল করা যায় না। ২০১৬ থেকে ২০২৫ সাল, ন’বছর চাকরি করার পর যদি কারও চাকরি বাতিল হয়, তাঁদের এবং তাঁদের পরিবারের উপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। এঁরা সমস্যা পড়বেন, পরিবার সমস্যায় পড়বে। বাঁচা মুশকিল হয়ে যাবে। তাই কারও চাকরি বাতিল হচ্ছে না। প্রত্যেকের চাকরি বহাল থাকছে। অর্থাৎ আগে যে ৩২ হাজার শিক্ষক-শিক্ষিকার চাকরি বাতিল হয়েছিল, তা বহালই রইল। স্কুল সার্ভিস কমিশনের ২০১৬ সালের পরীক্ষায় দুর্নীতির অভিযোগে যেভাবে গোটা প্যানেল বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বিচারপতিরা সম্পূর্ণ তার উল্টো পথে হেঁটে আজ বিচারপতি ঋতব্রত কুমার মিত্রের ডিভিশন বেঞ্চ বলে, ‘চাকরি করার সময় এই প্রার্থীদের বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ ওঠেনি। এমন কোনও তথ্য সামনে আসেনি যে, পরীক্ষকদের বেশি নম্বর দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কয়েকজন অসফল প্রার্থীর জন্য গোটা প্রক্রিয়ার ক্ষতি করতে দেওয়া যেতে পারে না। তাহলে অনেক সৎ প্রার্থীর গায়েও কালির ছিটে লেগে যাবে।’
প্রাথমিক ৩২,০০০ শিক্ষকের বহাল থাকার পরে স্বস্তিপ্রকাশ করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মালদা সফরের মধ্যেই মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘কথায় কথায় আদালতে গিয়ে চাকরি খেয়ে নেওয়ার বিষয়টা ঠিক নয়। আমাদের লক্ষ্য চাকরি দেওয়া, মোটেও চাকরি কেড়ে নেওয়া নয়। আমি বিচারব্যবস্থাকে শ্রদ্ধা করি। আমি সবথেকে খুশি যে আমার ভাইবোনেরা নিজেদের চাকরি ফিরে পেয়েছেন।’ অন্যদিকে শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু বলেছেন, ‘আজকে মহামান্য হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদ কে অভিনন্দন জানাই। হাইকোর্টের সিঙ্গেল বেঞ্চের রায় বাতিল হয়েছে। ৩২,০০০ প্রাথমিক শিক্ষকের চাকরি সম্পূর্ণ সুরক্ষিত রইল। শিক্ষকদেরও সতত শুভেচ্ছা। সত্যের জয় হল।’
প্রসঙ্গত, ২০১৪ সালের টেটের ভিত্তিতে ২০১৬ সালে প্রায় ৪২,৫০০ শিক্ষক নিয়োগ হয়েছিল। সেই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বেনিয়মের অভিযোগ ওঠে এবং মামলার পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৩ সালের ১২ই মে বিচারপতি অভিজিৎ গাঙ্গুলী প্রায় ৩২ হাজার চাকরি বাতিলের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে চাকরি বাতিলের পরও শিক্ষকদের স্কুলে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে তিন মাসের মধ্যে নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার নির্দেশ দেন।
সেই রায়কে চ্যালেঞ্জ করে কলকাতা হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চে মামলা হয়। বিচারপতি সুব্রত তালুকদার এবং বিচারপতি সুপ্রতিম ভট্টাচার্যের বেঞ্চ সিঙ্গল বেঞ্চের চাকরি বাতিলের রায়ের উপর অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ জারি করে এবং নতুন করে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করার নির্দেশ দেয়। পরবর্তীতে রাজ্য ও পর্ষদ সুপ্রিম কোর্টে যায়। শীর্ষ আদালত নির্দেশ দেয়, হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ সব পক্ষের বক্তব্য শুনে রায় দেবে।
১২ই নভেম্বর শুনানি শেষ হয়েছিল। হাইকোর্ট রায় স্থগিত রেখেছিল। আজ সেই মামলার রায় ঘোষণা হবে। মামলাকারীদের অভিযোগ, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছে এবং নিয়ম মানা হয়নি। অন্যদিকে রাজ্য সরকার ও পর্ষদের দাবি, দুর্নীতির কোনো প্রমাণ নেই, কেবল কিছু ভুল হয়েছিল যা সংশোধন করা হয়েছে। রাজনৈতিক অভিসন্ধি থেকেই দুর্নীতির অভিযোগ তোলা হচ্ছে বলে তাদের বক্তব্য।
সিঙ্গল বেঞ্চের তৎকালীন বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় এখন আর বিচারবিভাগে নেই। তিনি এখন পুরোদস্তর রাজনীতিক। তমলুকের বিজেপির সাংসদ। ডিভিশন বেঞ্চ এদিনের রায়ে জানিয়েছে, প্রাথমিকে নিয়োগের ব্যাপারে দুর্নীতি মামলার তদন্ত যে রকম চলছিল তা চলবে। তবে এভাবে ৯ বছর পর একসঙ্গে এতজনের চাকরি কেড়ে নেওয়া হলে শিক্ষা ব্যবস্থায় বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। তাঁদের পরিবার বড় সমস্যার মুখে পড়বে। এ ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে বিজেপি সাংসদ অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় বলেন, ‘ডিভিশন বেঞ্চ যদি মনে করে, হ্যাঁ এভাবেই মানুষকে রক্ষা করতে হবে, তাহলে ডিভিশন ঠিকই করেছে বলব।’ কিন্তু তার পরই বলেন, ‘আমি ভেবেছিলাম যে দুর্নীতি যারা করেছে, চাকরি যেভাবে বিক্রি হয়েছিল, সেই পুরো সিস্টেমটাকেই আমি বিসর্জন দিতে চেয়েছিলাম। তবে ডিভিশন বেঞ্চ যেটা ভাল বুঝেছে তা করেছে।’