সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
বাংলার বাইরে কাজ করতে যাওয়া বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকদের বাংলাদেশে পাঠাতে কেন্দ্রের এত কীসের তাড়া? একজন অন্তঃসত্ত্বা মহিলাকে দেশের বাইরে পাঠানোর আগে সব নিয়ম মেনে ছিলেন তো? এভাবেই আজ তীব্র ভর্ৎসনা করে কেন্দ্রের মোদি সরকারের লিখিত জবাবদিহি তলব করল কলকাতা হাইকোর্ট।
প্রসঙ্গত, শুধুমাত্র বাংলায় কথা বলার অপরাধে বাংলাদেশি সন্দেহে বীরভূমের পাইকরের বাসিন্দা সোনালিকে তাঁর পরিবার-সহ দিল্লি পুলিশ গত ২৬ জুন বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়। স্বামী দানিশ শেখ ও আট বছরের ছেলেকে সঙ্গে নিয়েই তাঁকে সীমান্তের ও পারে পাঠানো হয়েছে বলে অভিযোগ। সোনালির পরিবার এখন প্রশ্ন তুলছে—বাংলাদেশে যদি তাঁদের মেয়ে সন্তানের জন্ম দেন, তবে সেই নবজাতকের নাগরিকত্ব কী হবে? ভারতীয় জনতা পার্টি শাসিত দিল্লির ডাবল ইঞ্জিন সরকার বিএসএফের সাহায্যে সোনালীর পরিবারকে বাংলাদেশ ে পাঠিয়ে দিলেও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সঙ্গে কোনো রকম ভাবে যোগাযোগ করা হয়নি অথবা তার পরিবারের পক্ষ থেকে আধার কার্ড রেশন কার্ড এবং ভোটার কার্ড সহ যে সমস্ত ভারতীয় নাগরিকত্বের পরিচয় পত্র জমা দেওয়া হয়েছিল তা দেখার পরেও নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দিতে রাজি হয়নি। এই পরিস্থিতিতে কলকাতা হাইকোর্টে হেভিয়াস কর্পাস মামলা দায়ের করেছিল তার পরিবার এবং পশ্চিমবঙ্গ পরিযায়ী শ্রমিক কল্যাণ পর্ষদ।
বাংলাদেশি সন্দেহে আটক করার বিষয় নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে পশ্চিমবঙ্গ পরিযায়ী শ্রমিক কল্যাণ বোর্ডের তরফে জনস্বার্থ মামলা দায়ের হয়। গত ১৪ অগস্ট শীর্ষ আদালতে এই মামলার শুনানিতে মামলাকারীর পক্ষের আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ অভিযোগ করেন, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের জারি করা এক বিজ্ঞপ্তির ভিত্তিতে শুধুমাত্র বাংলায় কথা বলা এবং সেই ভাষায় থাকা নথির কারণে অনেককে হেনস্থার শিকার হতে হচ্ছে। পুলিশের বিরুদ্ধে অতিসক্রিয়তার অভিযোগ তুলে আটক করা বন্ধ রাখার আবেদন করা হয়। আবেদনের ভিত্তিতে কোনও অন্তবর্তীকালীন নির্দেশ না দিলেও জরুরী ভিত্তিতে কলকাতা হাইকোর্টকে এই মামলার শুনানি করার জন্য নির্দেশ দেয় সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি সূর্য কান্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর বেঞ্চ।
তার প্রেক্ষিতেই আজ কলকাতা হাইকোর্টে শুনানি চলাকালীন মামলা শোনার এক্তিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তোলায় কলকাতা হাই কোর্টের সমালোচনার মুখে পড়ল মোদি সরকার। মামলা শোনার এক্তিয়ারের প্রশ্নে কেন্দ্রের দাবি খারিজ করে দিল বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তী ও বিচারপতি ঋতব্রতকুমার মিত্রের ডিভিশন বেঞ্চ। সেই সঙ্গে কলকাতা হাইকোর্ট কেন্দ্রীয় সরকারকে তীব্র সমালোচনা করে বলে, বাংলাদেশে পরিযায়ী শ্রমিকদের পাঠাতে কেন্দ্রের এত কীসের তাড়া? যে ভাবে এবং যে পদ্ধতিতে ওই পরিবারকে বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে, সেই বিষয়ে হলফনামা দিয়ে তাদের বক্তব্য জানাবে কেন্দ্র। তার পাল্টা জবাব দেবে রাজ্য ও ম্যামলাকারীরা। মামলার পরবর্তী শুনানি ২৩ সেপ্টেম্বর।

কেন্দ্রের দেওয়া হলফনামা দেখিয়ে আদালতে মামলাকারী পরিযায়ী শ্রমিকদের পরিবার দাবি করেন, ২৪ জুন পুলিশ খতিয়ে দেখেই তাদের একদিন পরে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। তারা প্রকৃত এই দেশের নাগরিক কি না, তার খোঁজের কোনও চেষ্টা হয়নি। আদতে তারা মুরারাই পাইকরের আদি বাসিন্দা। ডিপোর্ট করার আগে সংশ্লিষ্ট রাজ্যের সঙ্গে আলোচনা করতে হয়। কেন্দ্রের ২০২৫ সালের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, রাজ্যের স্বরাষ্ট্র সচিবের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ডিএম যাবতীয় খোঁজখবর নিয়ে জানাবেন। একমাসে সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় নথি পাওয়া না গেলে তখনই দেশ থেকে বিতাড়িত করা যাবে। এখানে সেটা হয়নি। তারা এই রাজ্যের বাসিন্দা। এটাই এখানে মামলা হওয়ার পক্ষে সবচেয়ে বড় যুক্তি।
আগের দেওয়া রিপোর্ট উল্লেখ করে রাজ্য জানায়, এঁরা বীরভূমের বাসিন্দা সেসব তথ্য প্রমাণ-সহ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রককে জানানো হয়েছে আগেই। অথচ সেই রিপোর্টের এখনও কোনও জবাব দিল্লি প্রশাসন দেয়নি। এটা কতটা যুক্তিযুক্ত?