মাত্র ২,৫০০ জনের জমায়েত, দুপুর ১২টা থেকে সাড়ে ৩টে পর্যন্ত সভা—রাস্তার একাংশেই মঞ্চ, ১৮ জুলাইয়ের মধ্যে আয়োজকদের তালিকা জমা দেওয়ার নির্দেশ আদালতের
সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
কলকাতা: দীর্ঘ আইনি টানাপোড়েনের পর অবশেষে মিলল স্বস্তি। ২১ জুলাই শহীদ দিবস পালন নিয়ে কালীঘাট তৃণমূলের (TMC 21 July) অনিশ্চয়তার অবসান ঘটিয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দিল কলকাতা হাইকোর্ট (Kolkata High Court)। তবে সেই অনুমতি নিঃশর্ত নয়। একগুচ্ছ কঠোর শর্ত মেনে এবার বিড়লা প্ল্যানেটরিয়ামের (Birla Planetarium) সামনে শহীদ দিবসের কর্মসূচি আয়োজন করতে হবে।
এই নির্দেশের ফলে স্পষ্ট হয়ে গেল, এবারের ২১ জুলাই আর ধর্মতলার ঐতিহ্যবাহী মঞ্চে ফিরছে না। বরং আদালতের নির্ধারিত বিকল্প স্থানেই সীমিত পরিসরে কর্মসূচি করতে হবে। রাজনৈতিক মহলে এই নির্দেশকে ঘিরে শুরু হয়েছে নতুন জল্পনা।
বুধবার কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্যের একক বেঞ্চে মামলার শুনানি হয়। কালীঘাট তৃণমূলের পক্ষে আবেদন জানানো হয়েছিল শহীদ দিবস পালনের অনুমতির জন্য। আদালতে রাজ্য পুলিশের তরফে ধর্মতলায় সভার বিরোধিতা করা হয়। মূল শহরাঞ্চলে বিপুল জনসমাগম হলে যান চলাচল ও জনজীবনে বড় প্রভাব পড়বে বলে আদালতে জানানো হয়।
https://kolkatasaradin.com/2026/04/07/cityflo-kolkata-bus-service-launch/
শুনানি শেষে বিচারপতি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ভিক্টোরিয়া হাউস (Victoria House), এসপ্ল্যানেড ইস্ট (Esplanade East) কিংবা ডোরিনা ক্রসিং (Dorina Crossing)-এ কোনওভাবেই সভার অনুমতি দেওয়া যাবে না। কারণ, ওই এলাকায় জনসভা হলে কলকাতার প্রাণকেন্দ্র কার্যত অচল হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এরপর বিকল্প স্থান হিসেবে উঠে আসে বিড়লা প্ল্যানেটরিয়ামের সামনের রাস্তা। আদালত সেখানেই শর্তসাপেক্ষে সভার অনুমতি দেয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হল, সমাবেশে সর্বাধিক ২,৫০০ জন উপস্থিত থাকতে পারবেন। এর বেশি জমায়েত করা যাবে না। আদালতের মতে, অতিরিক্ত ভিড় হলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়বে এবং শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে।
সময়ের ক্ষেত্রেও কড়া অবস্থান নিয়েছে আদালত। নির্দেশ অনুযায়ী, ২১ জুলাই দুপুর ১২টা থেকে বিকেল সাড়ে ৩টে পর্যন্তই কর্মসূচি চালানো যাবে। নির্ধারিত সময়ের বাইরে সভা বা সমাবেশ চলবে না।
রাস্তা ব্যবহারের ক্ষেত্রেও স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছে আদালত। বিড়লা প্ল্যানেটরিয়ামের সামনে রাস্তার একদিকে মঞ্চ ও বসার ব্যবস্থা করতে হবে। অন্য দিকটি সম্পূর্ণভাবে যান চলাচলের জন্য খোলা রাখতে হবে। যাতে শহরের স্বাভাবিক ট্রাফিক ব্যাহত না হয়, সেই দায়িত্ব থাকবে ট্রাফিক পুলিশের ওপর।
আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখার দায়িত্বও সম্পূর্ণভাবে পুলিশ প্রশাসনের ওপর ছেড়ে দিয়েছে আদালত। কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা যাতে না ঘটে, সেজন্য পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
শুধু তাই নয়, সভার আয়োজকদের পরিচয় নিয়েও কড়া নির্দেশ রয়েছে। আগামী ১৮ জুলাই বিকেল ৪টার মধ্যে প্রধান আয়োজকদের নাম ও মোবাইল নম্বর কলকাতা পুলিশের জয়েন্ট সিপির দফতরে জমা দিতে হবে। এরপরই চূড়ান্ত প্রশাসনিক সমন্বয় হবে।

উল্লেখ্য, ১৯৯৪ সাল থেকে প্রতি বছর ধর্মতলায় শহীদ দিবস পালন করে আসছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)। দুই-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া এই রাজনৈতিক কর্মসূচির স্থান বদলায়নি। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর প্রশাসনের অবস্থান বদলায়। ধর্মতলায় আর অনুমতি দেওয়া সম্ভব নয় বলে জানানো হয়। সেই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করেই আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিল কালীঘাট তৃণমূল।
আদালতের এই রায়ে একদিকে যেমন কালীঘাট তৃণমূল কর্মসূচি করার সুযোগ পেল, অন্যদিকে স্পষ্ট বার্তা মিলল—আইনশৃঙ্খলা ও সাধারণ মানুষের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েই রাজনৈতিক কর্মসূচি পরিচালনা করতে হবে।
এবার নজর ২১ জুলাইয়ের দিকে। সীমিত পরিসরের এই সভা কি আগের মতোই রাজনৈতিক বার্তা দিতে পারবে? আদালতের বেঁধে দেওয়া শর্ত মেনে কালীঘাট তৃণমূল কতটা সফলভাবে কর্মসূচি সম্পন্ন করতে পারে, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। রাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্কে ২১ জুলাইয়ের এই নতুন অধ্যায় শেষ পর্যন্ত কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকেই তাকিয়ে রাজনৈতিক মহল।