সুহানা বিশ্বাস। কলকাতা সারাদিন।
কলকাতার অন্যতম জনপ্রিয় দুর্গাপুজোকে ঘিরে বড় রাজনৈতিক বার্তা! সুরুচি সঙ্ঘ (Suruchi Sangha Durga Puja)-র পুজো কমিটিতে এমন এক রদবদল হয়েছে, যা নিয়ে ইতিমধ্যেই জোর চর্চা শুরু হয়েছে রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক মহলে। বহু বছর ধরে যে কমিটির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে ছিলেন অরূপ বিশ্বাস (Arup Biswas) এবং তাঁর ভাই স্বরূপ বিশ্বাস (Swarup Biswas), সেই কমিটি থেকেই এবার তাঁদের নাম বাদ পড়েছে।
সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে সম্পাদক পদের পরিবর্তন। এতদিন ওই দায়িত্বে ছিলেন তৃণমূল নেতা স্বরূপ বিশ্বাস। নতুন কমিটিতে তাঁর জায়গায় সম্পাদক হয়েছেন উত্তর দমদমের বিজেপি বিধায়ক সৌরভ শিকদার (Sourav Sikdar)। অন্যদিকে, প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকেও সরিয়ে দেওয়া হয়েছে প্রাক্তন মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসকে। এই পরিবর্তনকে ঘিরে রাজনৈতিক মহলে নানা ব্যাখ্যা সামনে আসতে শুরু করেছে।
কলকাতা (Kolkata)-র দুর্গাপুজোর ইতিহাসে সুরুচি সঙ্ঘ বরাবরই অন্যতম আকর্ষণের কেন্দ্র। থিম, শিল্পকলা এবং আয়োজনের জন্য দেশ-বিদেশের দর্শকদের টানে এই পুজো। সেই পুজোর সঙ্গে বিশ্বাস পরিবারের দীর্ঘ সম্পর্ক ছিল বলেই পরিচিতি তৈরি হয়েছিল। টলিউডের বহু পরিচিত মুখও নিয়মিত এই ক্লাবের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতেন।
কিন্তু গত কয়েক মাসে পরিস্থিতি দ্রুত বদলেছে। মেসি-কাণ্ডকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়েন অরূপ বিশ্বাস। একাধিকবার তাঁকে পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে হয়েছে। একই সময়ে তিনি মূল তৃণমূল শিবির ছেড়ে ঋতব্রতপন্থী গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় রাজনৈতিক সমীকরণও বদলাতে শুরু করে।
অন্যদিকে, স্বরূপ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে ওঠা একাধিক অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। তোলাবাজি, হুমকি এবং ষড়যন্ত্র-সহ বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার হন তিনি। এরপর থেকেই সুরুচি সঙ্ঘকে ঘিরে বিতর্ক তীব্র হতে থাকে। একসময় যে ক্লাবকে বিশ্বাস-ভাইদের ঘাঁটি বলেই অনেকে চিনতেন, সেই ক্লাবেই এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন ছবি।
স্বরূপ বিশ্বাস গ্রেপ্তার হওয়ার পর স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের বিক্ষোভ ক্লাব প্রাঙ্গনে পৌঁছে যায়। ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে বলে অভিযোগ। পরে পুলিশ ক্লাবে ঢুকে তল্লাশি চালায় এবং তদন্তের স্বার্থে একাধিক নথি বাজেয়াপ্ত করে। সেই ঘটনার পর থেকেই ক্লাবের ভবিষ্যৎ পরিচালনা এবং কমিটির গঠন নিয়ে নানা জল্পনা চলছিল।
সেই জল্পনারই যেন বাস্তব রূপ মিলল নতুন কমিটি ঘোষণার পর। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, এই পরিবর্তন শুধুমাত্র একটি পুজো কমিটির রদবদল নয়; বরং কলকাতার সাংস্কৃতিক পরিসরে বদলে যাওয়া রাজনৈতিক বাস্তবতারও ইঙ্গিত বহন করছে। বিশেষ করে রাজ্যে ক্ষমতার পালাবদলের পর বিভিন্ন ক্লাব ও পুজো কমিটির নেতৃত্বে পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে যে আলোচনা চলছিল, সুরুচি সঙ্ঘের এই সিদ্ধান্ত সেই বিতর্ককে আরও উসকে দিল।
তবে এই পরিবর্তন নিয়ে এখনও পর্যন্ত অরূপ বিশ্বাস বা স্বরূপ বিশ্বাসের তরফে কোনও প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়া সামনে আসেনি। নতুন কমিটির পক্ষ থেকেও আনুষ্ঠানিকভাবে এই রদবদলের কারণ জানানো হয়নি। ফলে জল্পনা আরও বাড়ছে।
একদিকে কলকাতার অন্যতম ঐতিহ্যবাহী দুর্গাপুজো, অন্যদিকে রাজনৈতিক পালাবদলের আবহ— দুইয়ের মিলনে সুরুচি সঙ্ঘ এখন নতুন করে খবরের শিরোনামে। এই পরিবর্তন কি শুধুই প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, নাকি এর পিছনে রয়েছে আরও বড় রাজনৈতিক বার্তা? দুর্গাপুজোর আগে সেই উত্তর খুঁজতেই এখন নজর গোটা বাংলার।
এবার প্রশ্ন একটাই— সুরুচি সঙ্ঘের এই পালাবদল কি শুধু একটি ক্লাবের কমিটি বদল, নাকি বাংলার রাজনীতির আরও বড় পরিবর্তনের পূর্বাভাস?