কোয়ার্টার ফাইনালে আবারও অবশ্যম্ভাবী কিলিয়ান এমবাপে। পেনাল্টি মিস করেও গোল, বিশ্বকাপে ২০ ম্যাচে ২০ গোলের অবিশ্বাস্য রেকর্ড। তবে ম্যাচশেষে চোট নিয়ে বাড়ল ফরাসি শিবিরের দুশ্চিন্তা।
শৌভিক তালুকদার। কলকাতা সারাদিন।
বিশ্বকাপের মঞ্চে তাঁকে থামানো যেন ক্রমশ অসম্ভব হয়ে উঠছে। যত বড় ম্যাচ, ততই যেন ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠেন কিলিয়ান এমবাপে (Kylian Mbappe) (FIFA World Cup 2026)। মরক্কোর বিরুদ্ধে কোয়ার্টার ফাইনালেও সেই চেনা ছবিই দেখা গেল। প্রথমার্ধে পেনাল্টি থেকে গোল করতে না পারলেও দ্বিতীয়ার্ধে দুরন্ত ফিনিশে জাল কাঁপিয়ে ফ্রান্সকে (France) পৌঁছে দিলেন বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে।
শুধু ম্যাচ জেতানো গোলই নয়, এই গোলের সঙ্গে আরও একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক ছুঁয়ে ফেললেন ফরাসি অধিনায়ক। বিশ্বকাপের ইতিহাসে মাত্র ২০টি ম্যাচ খেলেই নিজের ২০তম গোল করে ফেললেন এমবাপে। আরও বিস্ময়ের বিষয়, এই ২০ গোলের মধ্যে ১২টিই এসেছে নক-আউট পর্বে। বড় ম্যাচের বড় তারকা হিসেবে তিনি যে নিজেকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছেন, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
এই বিশ্বকাপে এমবাপের গোলসংখ্যা এখন আট। একই সংখ্যক গোল রয়েছে লিওনেল মেসির (Lionel Messi) (Argentina) ঝুলিতেও। ফলে গোল্ডেন বুটের লড়াই আরও জমে উঠল। বিশ্বকাপ জয়ের পাশাপাশি ব্যক্তিগত সম্মানের লড়াইয়েও এখন একে অপরের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী এই দুই সুপারস্টার।
ম্যাচের শুরু থেকেই মরক্কো (Morocco) রক্ষণে কঠোর পরিকল্পনা নিয়ে নেমেছিল। এমবাপেকে ঘিরে রাখা, জায়গা না দেওয়া, শারীরিক ফুটবল—সব রকম কৌশলই দেখা যায়। প্রথমার্ধে পেনাল্টি পেয়েও গোল করতে ব্যর্থ হন ফরাসি অধিনায়ক। মনে হচ্ছিল, হয়তো এই দিনটা তাঁর নয়।
কিন্তু এমবাপেকে নিয়ে সবচেয়ে বড় সত্যিটাই আবার সামনে এল। তিনি সুযোগের অপেক্ষা করেন। আর সুযোগ এলেই মারাত্মক আঘাত হানেন।
ম্যাচের প্রায় এক ঘণ্টার মাথায় দুর্দান্ত গতিতে আক্রমণে উঠে নিখুঁত শটে মরক্কোর গোলরক্ষক বনোকে (Yassine Bounou) পরাস্ত করেন তিনি। মুহূর্তের মধ্যেই বদলে যায় ম্যাচের রং। মরক্কো ধীরে ধীরে ম্যাচে ফিরছিল, বলের দখলেও উন্নতি করছিল। ঠিক সেই সময় এমবাপের গোল তাদের সমস্ত পরিকল্পনা ভেঙে দেয়।
চার বছর আগে কাতার বিশ্বকাপেও মরক্কোর বিরুদ্ধে বিধ্বংসী ছিলেন এমবাপে। এবার অবশ্য তাঁকে আরও পরিণত ফুটবলার হিসেবে দেখা গেল। আগের মতো প্রতি মুহূর্তে দৌড় নয়, বরং ধৈর্য ধরে সঠিক মুহূর্তের অপেক্ষা। অনেকটা শিকারের অপেক্ষায় থাকা বাঘের মতো। আর সুযোগ মিলতেই প্রাণঘাতী থাবা।
এই পরিণত মানসিকতার জন্যই অনেক বিশেষজ্ঞ এখন এমবাপের সঙ্গে মেসির তুলনা টানছেন। ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ, সময় বোঝা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে দলের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেওয়ার ক্ষমতা—দু’জনের মধ্যেই এখন সেই মিল স্পষ্ট।
অন্যদিকে মরক্কোর জন্য শুরু থেকেই ধাক্কা ছিল তারকা ফরোয়ার্ড সাইবারির (Eliesse Ben Seghir/Saibari) অনুপস্থিতি। তাঁর বদলে সুযোগ পাওয়া চেমসদিন তালবি (Chemsdine Talbi) চেষ্টা করলেও আক্রমণে সেই ধার দেখা যায়নি। ফলে ফরাসি রক্ষণকে খুব বেশি সমস্যায় ফেলতে পারেনি আফ্রিকার প্রতিনিধিরা।
তবে মরক্কোর গোলরক্ষক বনো প্রথমার্ধে একাধিক দুর্দান্ত সেভ করে ম্যাচে দলকে টিকিয়ে রেখেছিলেন। বিশেষ করে ডায়ট উপামেকানোর (Dayot Upamecano) কাছ থেকে আসা প্রায় নিশ্চিত গোল বাঁচিয়ে তিনি দর্শকদের প্রশংসা কুড়িয়ে নেন। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে এমবাপে এবং উসমান দেম্বেলের (Ousmane Dembele) আক্রমণের সামনে শেষ পর্যন্ত তিনিও অসহায় হয়ে পড়েন।
ফ্রান্সের সামগ্রিক পারফরম্যান্সও ছিল অত্যন্ত পরিণত। মাঝমাঠ থেকে আক্রমণে দ্রুত রূপান্তর, রক্ষণে শৃঙ্খলা এবং সুযোগ কাজে লাগানোর দক্ষতা—সব মিলিয়ে তারা স্পষ্ট বুঝিয়ে দিল কেন এখনও শিরোপার অন্যতম দাবিদার তারা।
তবে জয় এলেও পুরোটা হাসিমুখে শেষ করতে পারেনি ফরাসি শিবির। ম্যাচের শেষদিকে মরক্কোর ডিফেন্ডার ইসা ডিয়পের (Issa Diop) একটি শক্ত চ্যালেঞ্জে পায়ের পাতায় চোট পান এমবাপে। তাঁকে কিছুক্ষণ ব্যথা নিয়েই খেলতে দেখা গেলেও পরে মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন। ডাগআউটে বসে তাঁর পায়ে বরফ লাগানোর দৃশ্য ফরাসি সমর্থকদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দেয়।
সেমিফাইনালে ফ্রান্সের সামনে অপেক্ষা করছে আরও কঠিন পরীক্ষা। সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ বেলজিয়াম (Belgium) অথবা স্পেন (Spain)—দুই দলই ইউরোপের শক্তিশালী ফুটবল শক্তি। সেই ম্যাচের আগে এমবাপের চোট কতটা গুরুতর, এখন সেদিকেই নজর গোটা ফুটবল বিশ্বের।

বিশ্বকাপের ইতিহাসে একের পর এক রেকর্ড গড়ে চলেছেন এমবাপে। বয়স এখনও তাঁর পক্ষে। সামনে রয়েছে আরও বহু বছর। কিন্তু আপাতত সব আলো একটাই প্রশ্নে—মেসির সঙ্গে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে কে এগিয়ে থাকবেন? আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, সেমিফাইনালের মঞ্চেও কি আবার নিজের ‘অবশ্যম্ভাবী’ রূপে ফিরবেন কিলিয়ান এমবাপে? উত্তর মিলবে আর মাত্র কয়েক দিনের অপেক্ষায়।