বারুইপুরে গণপিটুনির ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি, পুলিশের উদ্দেশে ৭২ ঘণ্টার সময়সীমা বেঁধে দিলেন শুভেন্দু অধিকারী
রাহুল সিংহ মজুমদার। কলকাতা সারাদিন।
‘মব লিঞ্চিং বা গণপিটুনি দিয়ে যাকে পিটিয়ে মারা হয়েছে, সেই ইন্দ্রজিৎ মণ্ডল সম্পূর্ণ নির্দোষ। এটি আমার কথা নয়, পুলিশ আমাকে প্রাথমিক তদন্তের পর যা জানিয়েছে সেটাই বলছি। আমি ওঁর শোকার্ত পরিবারের সঙ্গেও দেখা করেছি।’ দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরে নাবালিকাকে অপহরণ করে ধর্ষণ এবং খুনের অভিযোগের পাশাপাশি সেই ঘটনায় অন্যতম অভিযুক্ত হিসেবে এক ব্যক্তিকে ধরে স্থানীয় বাসিন্দাদের গণপিটুনি এবং সেই ব্যক্তির মৃত্যুর প্রেক্ষিতে বাড়িপুর জেলা পুলিশের সঙ্গে বৈঠকের পরে এমন হুঁশিয়ারি দিলেন মুখ্যমন্ত্রী তথা রাজ্যের পুলিশ মন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। গত তিনদিন ধরে বারুইপুর এলাকায় এই দুই মৃত্যুর জেরে উত্তপ্ত হয়ে থাকায় ইতিমধ্যেই বারুইপুর পুলিশ জেলার অন্তর্ভুক্ত নরেন্দ্রপুর সোনারপুর এবং বারুইপুর থানা এলাকায় জারি করা হয়েছে ভারতীয় নেয় সংহিতার ১৬৩ ধারা। মঙ্গলবার বারুইপুরে তদন্তের অগ্রগতি জানার পাশাপাশি দুই নিহতের পরিবারের সঙ্গেও কথা বলেন মুখ্যমন্ত্রী।
বৈঠক শেষে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ধৃত মূল অপরাধীদের পাশাপাশি আইন হাতে তুলে নিয়ে যারা সরকারি সম্পত্তি ধ্বংস করেছে এবং পিছন থেকে উসকানি দিয়েছে, তাদের প্রত্যেককে চিহ্নিত করে কঠোর শিক্ষা দেওয়া হবে। এ দিন রাজ্য পুলিশের ডিজি সিদ্ধনাথ গুপ্তার উপস্থিতিতেই পুলিশি নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগে তদন্তের জন্য ৭২ ঘণ্টার সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
স্থানীয় উত্তেজনার জেরে সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর যাতে না হয় অথবা হলেও সেই ধরনের ঘটনায় ক্ষতিপূরণ আদায়ের জন্য কয়েকদিন আগেই রাজ্য বিধানসভায় রাজ্যের নতুন বিজেপি সরকার পাস করিয়েছে নতুন গুন্ডা দমন বিল। বারুইপুরের ঘটনার প্রেক্ষিতেও সংলগ্ন এলাকায় পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর এবং রেললাইন উপড়ে ফেলার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে মুখ্যমন্ত্রী জানান, সিসিটিভি ও ভিডিও ফুটেজ দেখে ইতিমধ্যেই প্রায় ১০০ জন তাণ্ডবকারীকে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রত্যেককে দ্রুত গ্রেফতার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে এই হিংসার পিছনে থাকা রাজনৈতিক উস্কানিদাতাদেরও কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ‘যারা নির্বাচনে সাধারণ মানুষের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন, কেউ ক্ষমতা হারিয়েছেন আবার কেউ শূন্য থেকে এক হয়েছেন—এমন কিছু দেশবিরোধী শক্তি পিছন থেকে উস্কানি দিয়েছে। এসটিএফ এদের কল রেকর্ড-সহ যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ করেছে। এদের কাউকেই রেয়াত করা হবে না।’
বারুইপুরে প্রশাসনিক বৈঠক
বারুইপুরে গিয়ে পুলিশ কর্তা এবং প্রশাসনিক আধিকারিকদের সঙ্গে বৈঠকের পাশাপাশি এলাকার জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গেও বৈঠকে বসেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে সায়নী, ঋতব্রতেরা ছিলেন। এমনকি, ওই বিধানসভার বিধায়ক বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়ও ছিলেন বৈঠকে। বিজেপির তিন বিধায়ক—গোসাবার বিকর্ণ নস্কর, রূপা গঙ্গোপাধ্যায় এবং দেবাশিস ধর মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে তাঁদের বক্তব্য জানান। মুখ্যমন্ত্রী তাঁদেরও তদন্তের অগ্রগতি এবং পুলিশের আগামী পদক্ষেপের বিষয়ে বিশদে ব্রিফ করেন। এসপি অফিসে বৈঠকের পর সোনারপুর দক্ষিণের বিধায়ক রূপা গঙ্গোপাধ্যায় বলেন, ‘আমাদের সকলের সঙ্গে কথা বলেছেন মুখ্যমন্ত্রী। আমাদের থেকে সবিস্তার ঘটনা সম্পর্কে জেনেছেন। তিনি স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে কোনও অপরাধী ছাড় না পায়। দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে, যাতে কেউ ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা ঘটাতে না পারে।’
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘এক সপ্তাহের মধ্যে আবার আসব, সরকার যা করছে, দেখতে পাবেন। ২ পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছি, আউটপোস্ট চালু করব। আগের সরকার এমন করেছে বলে জানা নেই, কিন্তু এটা আমার কর্তব্য। বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়, সায়নী ঘোষরা পরিবারের সঙ্গে দেখা করেছেন। আশা করি তাঁরাও পরিবারের সঙ্গে কথা বলে সন্তুষ্ট। রাজ্যের পুলিশ কর্তাদের বলেছি, এই ধরনের ঘটনা আটকাতে হবে। ন্যায় সংহিতা, সুপ্রিম কোর্ট, পকসো আইন–যা যা আছে।’

৭২ ঘন্টার ডেডলাইন মুখ্যমন্ত্রীর
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘রাজ্য সরকারের যা মনোভাব, তা মেনে চলতে হবে। আগের দিন মিসিং ডায়েরি হয়েছিল, আমি সব খতিয়ে দেখেছি। ডিজিপিকে ৭২ ঘণ্টা সময় দিয়েছি, রিপোর্ট পেলেই ব্যবস্থা নেব। এই সময়ের মধ্যে ১% শিথিলতা থাকলেও কড়া অ্যাকশন হবে।’ আর জি করের প্রসঙ্গ টেনে শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ‘আর জি কর মেডিক্যালকাণ্ডে ৩ আইপিএস অফিসারকে সাসপেন্ড করেছি। আমাদের সরকারের উপরে আস্থা রেখেছে পরিবার, এটা বড় প্রাপ্তি। নিরীহ যুবককে যারা গণপিটুনিতে মেরেছে, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা হবে। ২০০-র বেশি লোক চিহ্নিত, যাদের ইন্ধন ছিল, তাদেরও ছাড়া হবে না। যারা ইন্ধন দিয়েছে, তারাও কিন্তু ভুগবে।’ প্রসঙ্গত, গতকালই শুভেন্দু আশ্বাস দিয়েছিলেন এই ঘটনায় ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট দেওয়া হবে। তিনি বলেছিলেন, ‘জঘন্যতম ঘটনা। আইজি-র নেতৃত্বে এসটিএফ কাজ করছে। পরিবার যা চেয়েছে, তা করার ব্যবস্থা করছে সরকার। ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট দেওয়া হবে।’