ধর্ষণ, খুন, অপহরণ থেকে পকসো—একাধিক ধারায় মামলা। ময়নাতদন্তের রিপোর্টে উঠে এল শিউরে ওঠার মতো তথ্য। উত্তপ্ত বারুইপুরে বাড়ছে ক্ষোভ, আজ ঘটনাস্থলে মুখ্যমন্ত্রী।
রাহুল সিংহ মজুমদার। কলকাতা সারাদিন।
বারুইপুর (Baruipur) যেন এখনও আতঙ্ক আর ক্ষোভে থমথমে। ১২ বছরের এক নাবালিকার মৃত্যুকে ঘিরে প্রতিদিন সামনে আসছে নতুন নতুন তথ্য, আর প্রতিটি তথ্যই আরও ভয়ঙ্কর। এবার ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্টে উঠে এসেছে এমন সব তথ্য, যা গোটা রাজ্যকে নাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নাবালিকার শরীরে অন্তত ৩৫টি আঘাতের চিহ্ন মিলেছে। শুধু তাই নয়, যৌন নির্যাতনের স্পষ্ট প্রমাণও পাওয়া গিয়েছে। সবচেয়ে হৃদয়বিদারক তথ্য—তাকে যখন জলাশয়ে ফেলে দেওয়া হয়, তখনও সে জীবিত ছিল বলে ময়নাতদন্তে ইঙ্গিত মিলেছে।
তদন্তকারী সূত্রের দাবি, নাবালিকার মৃত্যু হয়েছে দুটি কারণের সম্মিলিত প্রভাবে। প্রথমত, ভারী কোনও বস্তু দিয়ে মাথায় একাধিক জোরালো আঘাত করা হয়েছিল। সেই আঘাতে মাথায় গুরুতর চোট লাগে। এরপর তাকে জলাশয়ে ফেলে দেওয়া হয়। চিকিৎসক ও ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের মতে, জলে ডুবে যাওয়াই শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
ময়নাতদন্তে আরও জানা গিয়েছে, মুখ, ঠোঁট, বুক, মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন অংশে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। যৌনাঙ্গেও গুরুতর আঘাতের দাগ পাওয়া গিয়েছে। সেই কারণেই তদন্তকারীরা যৌন নির্যাতনের অভিযোগকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন। ধর্ষণের অভিযোগের চূড়ান্ত নিশ্চিতকরণের জন্য প্রয়োজনীয় নমুনা ইতিমধ্যেই ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।
এই ঘটনার তদন্তে পুলিশ (West Bengal Police) ইতিমধ্যেই একাধিক কঠোর ধারা যুক্ত করেছে। ধর্ষণ, গণধর্ষণ, খুন, অপহরণ, তথ্যপ্রমাণ নষ্ট করার চেষ্টা, অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র এবং পকসো আইনের বিভিন্ন ধারায় মামলা দায়ের হয়েছে। সোমবার মূল অভিযুক্ত আনন্দ সরদার (Ananda Sardar)-কে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর আগে ধরা পড়েছিল প্রভাস সরদার (Prabhas Sardar) ও দিবাকর সরদার (Dibakar Sardar)। ফলে এই মামলায় মোট গ্রেপ্তার হওয়া অভিযুক্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে তিন।
সোমবার ধৃতদের বারুইপুর আদালতে তোলা হলে আদালত ১৪ দিনের পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ দেয়। উল্লেখযোগ্যভাবে, অভিযুক্তদের পক্ষে কোনও আইনজীবী সওয়াল করতে এগিয়ে আসেননি। তদন্তকারীদের মতে, এখনও একাধিক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আসা বাকি।
পুলিশ সূত্রে খবর, ধৃত প্রভাস সরদার বারবার নিজের বয়ান বদলাচ্ছে। প্রথমে সে দাবি করেছিল, ঘটনার সঙ্গে তার কোনও সম্পর্ক নেই। পরে আবার তদন্তকারীদের জানিয়েছে, তাকে ১০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছিল নাবালিকাকে অটোয় তুলে নিয়ে আসার জন্য। এমনকি পাচারের কথাও বলা হয়েছিল বলে সে দাবি করেছে। তবে রবিবার যে মুক্তিপণ তত্ত্বের কথা সে বলেছিল, সোমবার তা সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে। তদন্তকারীদের মতে, এই পরস্পরবিরোধী বয়ান তদন্তকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা হতে পারে।
অন্যদিকে, অভিযুক্ত দিবাকর ও আনন্দ দু’জনেই দাবি করেছে, ঘটনার দিন তারা এলাকায় ছিল না। দিবাকরের পরিবারও তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ মানতে নারাজ। আনন্দের বাড়ি বর্তমানে তালাবন্ধ। যদিও স্থানীয়দের একাংশের দাবি, এলাকায় মেয়েদের উত্ত্যক্ত করার অভিযোগ আগে থেকেই ছিল আনন্দের বিরুদ্ধে। যদিও সেই অভিযোগের সরকারি নিশ্চিতকরণ এখনও হয়নি। আনন্দের স্ত্রী থানায় গিয়ে দাবি করেছেন, ঘটনার সময় তাঁর স্বামী এলাকায় ছিলেন না এবং তিনি নির্দোষ। তবে তদন্তকারীরা এই বক্তব্যে আশ্বস্ত নন।
পুলিশের কাছে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন দুটি—এই অপরাধের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী ছিল এবং কেন এত নৃশংসভাবে নির্যাতন করা হল? তদন্তকারী সূত্রে জানা যাচ্ছে, নাবালিকা প্রাণ বাঁচানোর জন্য শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত প্রতিরোধ করেছিল। তার চিৎকার থামাতে গলায় চাপ দেওয়া হয়েছিল বলেও তদন্তে উঠে এসেছে। ময়নাতদন্তে নখের আঁচড়, কামড়ের দাগ এবং শরীরের বিভিন্ন অংশে গভীর ক্ষতের উল্লেখ তদন্তকে আরও জোরালো করেছে।
এই নৃশংস ঘটনার জেরে বারুইপুরে (Baruipur) এখনও থামেনি জনরোষ। সোমবারও সূর্যপুরহাট এলাকায় বিক্ষোভ দেখা যায়। স্থানীয় বাসিন্দাদের একটাই দাবি—দোষীদের দ্রুততম সময়ে কঠোর শাস্তি দিতে হবে। এলাকায় এখনও টানটান উত্তেজনা বজায় রয়েছে।
এদিকে ঘটনাটি নিয়ে রাজনৈতিক মহলেও শুরু হয়েছে তীব্র প্রতিক্রিয়া। রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) জানিয়েছেন, অপরাধীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং পরিবারের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সবরকম পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি সাম্প্রতিক অশান্তি নিয়ে তিনি রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের অভিযোগও তুলেছেন। তবে সেই দাবির স্বাধীনভাবে সরকারি বা তদন্তকারী সংস্থার তরফে এখনও কোনও নিশ্চিত প্রমাণ প্রকাশ করা হয়নি।
প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে, মঙ্গলবার ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যাওয়ার কথা রয়েছে মুখ্যমন্ত্রীর। নিহতের পরিবারের সঙ্গে দেখা করে তাঁদের পাশে থাকার বার্তা দিতে পারেন তিনি। একইসঙ্গে তদন্তের অগ্রগতি নিয়েও উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বারুইপুরের এই ঘটনা শুধু একটি ফৌজদারি মামলাই নয়, রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলা, শিশু নিরাপত্তা এবং বিচারব্যবস্থাকে ঘিরে নতুন করে একাধিক প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। এখন নজর তদন্তের পরবর্তী ধাপে, ফরেনসিক রিপোর্টে এবং আদালতের পরবর্তী নির্দেশে। এই মামলায় শেষ পর্যন্ত কী সত্য সামনে আসবে, আর দোষীরা কবে আইনের সর্বোচ্চ শাস্তির মুখোমুখি হবে—সেই উত্তরেই তাকিয়ে গোটা বাংলা।