‘আমরাই ঠিক করব দলের প্রতিনিধি’— কমিশনের ভূমিকা নিয়ে সরব সৌগত রায়, পাল্টা ‘আসল তৃণমূল’-এর দাবিতে দিল্লিতে শক্তি প্রদর্শন ঋতব্রত শিবিরের।
সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
তৃণমূলের (All India Trinamool Congress) অন্দরের দ্বন্দ্ব এবার পৌঁছে গেল জাতীয় নির্বাচন কমিশনের (Election Commission of India) দরজায়। দিল্লিতে কমিশনের ফুল বেঞ্চের সঙ্গে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন শিবিরের বৈঠক শেষ হতেই রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। আর সেই বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করলেন ‘কালীঘাট তৃণমূল’-এর অন্যতম মুখ সৌগত রায় (Saugata Roy)।
বুধবার সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে সৌগত রায় সরাসরি প্রশ্ন তোলেন, “যাদের দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে, তারা কীভাবে নির্বাচন কমিশনের ফুল বেঞ্চের সঙ্গে বৈঠকের সময় পেল?” তাঁর এই মন্তব্য ঘিরে রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে চর্চা শুরু হয়েছে।
সৌগত রায়ের দাবি, নির্বাচন কমিশন আগে জানিয়েছিল যে শুধুমাত্র স্বীকৃত প্রতিনিধিরাই কমিশনের সঙ্গে বৈঠক করতে পারেন। সেই অবস্থায় দলের আনুষ্ঠানিক নেতৃত্ব কোনও সাক্ষাতের আবেদন না করলেও, কীভাবে ভিন্নমতাবলম্বী বিধায়কদের একটি প্রতিনিধি দল কমিশনের সঙ্গে বৈঠকের সুযোগ পেল, সেই প্রশ্নই এখন সামনে আসছে।
তিনি আরও বলেন, “আমাদের দলের প্রতিনিধি কে হবেন, সেটা দলই ঠিক করবে। নির্বাচন কমিশনের কাজ সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া নয়। যে কেউ চাইলে কি কমিশনের ফুল বেঞ্চের সঙ্গে দেখা করতে পারে?” তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, কমিশনের ভূমিকা নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেছে ‘কালীঘাট তৃণমূল’ শিবির।
অন্যদিকে, দিল্লিতে জাতীয় নির্বাচন কমিশন (Election Commission of India)-এর সদর দফতরে প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে ফুল বেঞ্চের সঙ্গে বৈঠক করেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় (Ritabrata Banerjee), অরূপ রায় (Arup Roy), আখরুজ্জামান, জাভেদ খান এবং সন্দীপন সাহা-সহ মোট ১০ জন বিধায়ক।
বৈঠকের পর অরূপ রায় জানান, তাঁদের পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনের কাছে নতুন সাংগঠনিক কাঠামো, বৈঠকের সিদ্ধান্ত এবং দলের পুনর্গঠনের সমস্ত নথি লিখিতভাবে জমা দেওয়া হয়েছে। তাঁর দাবি, দলের গঠনতন্ত্র মেনেই সব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং সেই বিষয়টি কমিশনকে বিস্তারিতভাবে জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় আরও বড় দাবি সামনে আনেন। তাঁর বক্তব্য, অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেসের প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব এখন তাঁদের হাতেই রয়েছে। তিনি বলেন, দলের দুই-তৃতীয়াংশ বিধায়ক, একাধিক প্রাক্তন মন্ত্রী, পুরপ্রতিনিধি এবং জেলা পরিষদের সদস্যরা তাঁদের পাশে রয়েছেন।
উল্লেখ্য, গত ২২ জুন ঋতব্রত শিবির নতুন জাতীয় কর্মসমিতির ঘোষণা করে। সেই তালিকায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) কিংবা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় (Abhishek Banerjee)— কারও নাম রাখা হয়নি। পরিবর্তে দলের চেয়ারম্যান হিসেবে ঘোষণা করা হয় অরূপ রায়ের নাম। পাশাপাশি সহ-সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয় ফিরহাদ হাকিম (Firhad Hakim) এবং অরূপ বিশ্বাস (Aroop Biswas)-কে।
পরের দিনই এই নতুন কমিটির তালিকা রাজ্য নির্বাচন কমিশনের কাছেও জমা দেওয়া হয়। এরপর দিল্লিতে গিয়ে জাতীয় নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বৈঠক করায় গোটা বিষয়টি আরও রাজনৈতিক গুরুত্ব পেয়েছে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই লড়াই শুধুমাত্র সাংগঠনিক নেতৃত্বের নয়, ভবিষ্যতে দলের প্রতীক, স্বীকৃতি এবং রাজনৈতিক বৈধতা নিয়েও বড় আইনি ও সাংবিধানিক বিতর্কের দিকে এগোতে পারে। যদিও নির্বাচন কমিশন এখনও এই বিষয়ে কোনও আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত জানায়নি।
এখন নজর একটাই—দুই পক্ষের দাবি-প্রতিদাবির পর কমিশনের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে? তৃণমূলের অন্দরের এই সংঘাত কি শুধুই রাজনৈতিক চাপানউতোরে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি আগামী দিনে আরও বড় মোড় নেবে? উত্তর খুঁজছে গোটা বাংলা।