গণনাকেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া, ইভিএম নিয়ে প্রশ্ন, রিটার্নিং অফিসারকে ঘিরে বিতর্ক— ভবানীপুর ফলাফলকে আদালতে টানলেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী
শৌনক মন্ডল। কলকাতা সারাদিন।
রাজ্যের রাজনীতিতে ফের বড় চাঞ্চল্য। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে (Bhabanipur Assembly Election) পরাজয়ের এক মাসের মধ্যেই আইনি লড়াইয়ের পথে হাঁটলেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)। ভবানীপুর কেন্দ্রের ভোট গণনা এবং ফল প্রকাশের প্রক্রিয়ায় গুরুতর অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ তুলে তিনি কলকাতা হাইকোর্টে (Calcutta High Court) ইলেকশন পিটিশন দায়ের করেছেন।
মঙ্গলবার আদালতে নিজে উপস্থিত হয়ে এই মামলা দায়ের করেন তৃণমূল নেত্রী। তাঁর সঙ্গে ছিলেন তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ দোলা সেন (Dola Sen) এবং বিধায়ক কুণাল ঘোষ (Kunal Ghosh)। আদালত চত্বরে তাঁর উপস্থিতি ঘিরে তৈরি হয় রাজনৈতিক জল্পনা।
২০২৬ সালের নির্বাচনে ভবানীপুরে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)-র কাছে প্রায় ১৫ হাজার ভোটে পরাজিত হন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ফল প্রকাশের পর থেকেই তিনি ভোট গণনার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। এবার সেই অভিযোগই পৌঁছে গেল আদালতের দরজায়।
তৃণমূল সূত্রের দাবি, গণনার প্রথম দিকের একাধিক রাউন্ডে এগিয়ে ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু পরে হঠাৎ পরিস্থিতি বদলে যায়। ভোট গণনার পুরো প্রক্রিয়াতেই একাধিক অসঙ্গতি ছিল বলে অভিযোগ করা হয়েছে পিটিশনে।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলির মধ্যে রয়েছে গণনাকেন্দ্রে প্রার্থী ও তাঁর নির্বাচনী প্রতিনিধিদের সঙ্গে আচরণ নিয়ে প্রশ্ন। তৃণমূলের দাবি, নির্দিষ্ট পর্যায়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর এজেন্টদের গণনাকেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল। এর ফলে গণনার স্বচ্ছতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে বলে তাদের বক্তব্য।
এছাড়াও ভোট গণনার গতি অস্বাভাবিকভাবে ধীর ছিল বলেও অভিযোগ উঠেছে। ফল প্রকাশের দিন পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে মমতা নিজেই গণনাকেন্দ্রে পৌঁছেছিলেন। সেখান থেকেই শুরু হয় বিতর্কের নতুন অধ্যায়।
মামলা দায়েরের পর বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন তৃণমূল সাংসদ ও আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় (Kalyan Banerjee)। তাঁর দাবি, শুধু গণনাই নয়, গোটা নির্বাচনী প্রক্রিয়াতেই গুরুতর গরমিল ছিল।
কল্যাণের বক্তব্য, যে রিটার্নিং অফিসার ভবানীপুরে দায়িত্বে ছিলেন, তিনি ২০২১ সালের নন্দীগ্রাম নির্বাচনের সময়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় ছিলেন। পরবর্তীতে তাঁকে মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তরে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। একইসঙ্গে তৎকালীন মুখ্য নির্বাচন আধিকারিকের পরবর্তী প্রশাসনিক পদোন্নতি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তৃণমূল সাংসদ।
যদিও এই সমস্ত অভিযোগের সত্যতা আদালতেই বিচার হবে। এখনও পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন বা সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের তরফে এ বিষয়ে কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া সামনে আসেনি।
রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে, এই মামলা শুধুমাত্র একটি কেন্দ্রের ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন নয়; বরং আগামী দিনের রাজ্য রাজনীতির অন্যতম বড় আইনি লড়াই হয়ে উঠতে পারে। কারণ এর আগে ২০২১ সালের নন্দীগ্রাম (Nandigram) কেন্দ্রের ফলাফল নিয়েও আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই মামলার নিষ্পত্তি এখনও হয়নি।

নির্বাচনী আইন অনুযায়ী, কোনও প্রার্থী ভোট গণনা বা ফল প্রকাশের প্রক্রিয়া নিয়ে আপত্তি জানালে আদালত প্রয়োজন হলে ইভিএম সংরক্ষণ, নথি তলব বা অন্যান্য নির্দেশ দিতে পারে। ফলে ভবানীপুর মামলার পরবর্তী শুনানির দিকে এখন নজর রাজনৈতিক মহল থেকে সাধারণ ভোটার— সকলেরই।
ভবানীপুরের ফলাফল নিয়ে শুরু হওয়া এই নতুন আইনি লড়াই শেষ পর্যন্ত কোন দিকে মোড় নেবে? আদালত কি নতুন কোনও নির্দেশ দেবে, নাকি আগের মতো দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যেই আটকে থাকবে মামলা? এখন সেই প্রশ্নই ঘুরছে রাজ্যের রাজনৈতিক অন্দরে।