ভবানীপুর ভোট মামলা ঘিরে নতুন মোড়, নথি না পৌঁছানোয় রিপোর্ট তলব আদালতের। দ্রুত নিষ্পত্তির আর্জি মমতা শিবিরের।
শৌনক মন্ডল। কলকাতা সারাদিন।
রাজনৈতিক লড়াই শেষ হলেও আইনি লড়াই এখনও অনেক বাকি। ভবানীপুর (Bhabanipur Election Case) বিধানসভা কেন্দ্রের নির্বাচনী ফলকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে দায়ের করা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Mamata Banerjee) ইলেকশন পিটিশনের শুনানি মঙ্গলবার আবারও পিছিয়ে গেল কলকাতা হাইকোর্টে (Calcutta High Court)। আর সেই শুনানিতেই সামনে এল একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
শুনানি শুরু হতেই শুভেন্দু অধিকারীর (Suvendu Adhikari) আইনজীবী আদালতের কাছে আরও চার সপ্তাহ সময় চান। তাঁর যুক্তি, মামলার নথিপত্র সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত করতে অতিরিক্ত সময় প্রয়োজন। আদালত সেই আবেদন বিবেচনায় নেয়।
তবে দিনের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল অন্যটি। আদালতের নজরে আসে, মামলার প্রয়োজনীয় নথি এখনও পর্যন্ত যথাযথভাবে সংশ্লিষ্ট পক্ষের কাছে পৌঁছায়নি। বিষয়টি সামনে আসতেই অসন্তোষ প্রকাশ করেন বিচারপতি গৌরাঙ্গ কান্ত। তিনি হাইকোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের কাছে এ বিষয়ে বিস্তারিত রিপোর্ট তলব করেন এবং নোটিশ জারি সংক্রান্ত প্রক্রিয়া কীভাবে ব্যাহত হল, তার ব্যাখ্যাও চান।
এই মামলার গুরুত্ব অনেক আগেই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ভবানীপুর কেন্দ্রে পরাজয়ের পর ফলাফলকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর আবেদনে অভিযোগ করা হয়, ভোট গণনার সময় একাধিক অনিয়ম হয়েছে। এমনকি গণনাকেন্দ্রে তাঁর নির্বাচনী এজেন্টকে মারধর করে বাইরে বের করে দেওয়ার অভিযোগও পিটিশনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর আগে, গত ১৬ জুন মামলার প্রাথমিক শুনানিতে কলকাতা হাইকোর্ট গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দিয়েছিল। ভোট গণনার দিনের সমস্ত সিসিটিভি ফুটেজ, ইভিএম, ভিভিপ্যাট এবং সংশ্লিষ্ট নথি সংরক্ষণ করার নির্দেশ দেয় আদালত। পাশাপাশি মামলার সমস্ত বিবাদী পক্ষকে আইন মেনে নোটিশ পাঠানোর দায়িত্ব দেওয়া হয় হাইকোর্টের অরিজিনাল সাইডের রেজিস্ট্রারকে।
কিন্তু আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সেই নোটিশ যথাযথভাবে জারি না হওয়ায় গোটা প্রক্রিয়াতেই নতুন জটিলতা তৈরি হয়েছে। ফলে বিচারপতি নতুন করে সব পক্ষকে নোটিশ পাঠানোর নির্দেশ দেন।
শুনানির সময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় আদালতের সামনে এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য, কলকাতা হাইকোর্টে ইলেকশন পিটিশন নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে অতীতে দীর্ঘসূত্রিতার নজির রয়েছে। তিনি বলেন, বহু ক্ষেত্রেই পাঁচ বছর কেটে গেলেও এমন মামলা শেষ হয় না। আদালতের কাছে তাঁর আবেদন ছিল, এই মামলায় যেন দ্রুত শুনানি শেষ করে একটি নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করা হয়।
কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, দীর্ঘ আইনজীবী জীবনে খুব কম ক্ষেত্রেই তিনি দেখেছেন, নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই কোনও ইলেকশন পিটিশনের নিষ্পত্তি হয়েছে। তাই বর্তমান মামলায় দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার আবেদন জানান তিনি।
জবাবে বিচারপতি গৌরাঙ্গ কান্ত স্পষ্ট করে বলেন, আদালত এই মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে তিনি নির্দেশ দেন, আইন অনুযায়ী সমস্ত পক্ষকে পুনরায় নোটিশ পাঠিয়ে পরবর্তী শুনানির প্রস্তুতি সম্পূর্ণ করতে হবে।
এই মামলার রাজনৈতিক গুরুত্বও কম নয়। কারণ ভবানীপুরের ফলাফল নিয়ে শুরু হওয়া বিতর্ক এখন আদালতের পর্যবেক্ষণের কেন্দ্রে। আদালতের প্রতিটি নির্দেশ তাই রাজনৈতিক মহল থেকে সাধারণ মানুষের নজর কেড়েছে।
এখন নজর পরবর্তী শুনানির দিকে। নথিপত্রের জট কেটে কি দ্রুত এগোবে মামলার শুনানি, নাকি আরও দীর্ঘ হবে আইনি লড়াই? ভবানীপুরের এই বহুচর্চিত নির্বাচন মামলা কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকেই এখন তাকিয়ে রাজ্যের রাজনৈতিক মহল।