দীর্ঘ মন্দার পর স্বস্তির হাওয়া। বাংলাদেশ থেকে ফের বাড়ছে রোগীর আনাগোনা, নতুন আশায় চিকিৎসা মহল।
শৌভিক তালুকদার। কলকাতা সারাদিন।
বাংলার চিকিৎসা পরিষেবার জন্য যেন এল বড় স্বস্তির খবর। দীর্ঘদিনের স্থবিরতার পর আবারও বাংলাদেশের নাগরিকদের ভিড় বাড়তে শুরু করেছে কলকাতা (Kolkata Medical Tourism) ও রাজ্যের বিভিন্ন হাসপাতাল-নার্সিংহোমে। কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য ট্যুরিস্ট ভিসা শিথিল করার সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার পর থেকেই সীমান্ত পেরিয়ে চিকিৎসার উদ্দেশ্যে আসা মানুষের সংখ্যা চোখে পড়ার মতো বেড়েছে।
চিকিৎসা মহলের একাংশের মতে, এই সিদ্ধান্ত শুধু রোগীর সংখ্যা বাড়াবে না, পশ্চিমবঙ্গের বহু কোটি টাকার মেডিকেল ট্যুরিজম শিল্পেও নতুন প্রাণ ফেরাতে পারে। গত দু’বছরের ধাক্কার পর এমন ছবি অনেকেই আশা করেননি।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতার পর ভারত সরকার নিরাপত্তাজনিত কারণে ট্যুরিস্ট ভিসা প্রদান অনেকটাই সীমিত করে দেয়। যদিও মানবিক কারণ বিবেচনায় মেডিকেল ভিসা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি, কিন্তু কড়াকড়ির ফলে চিকিৎসার জন্য পশ্চিমবঙ্গে আসা বাংলাদেশি রোগীর সংখ্যা দ্রুত কমে যায়। তার সরাসরি প্রভাব পড়ে কলকাতা (Kolkata Hospitals), শিলিগুড়ি (North Bengal Healthcare) এবং সীমান্তবর্তী একাধিক চিকিৎসাকেন্দ্রের ওপর।
পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে কয়েক সপ্তাহ আগে। দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় সরকার প্রথমে মেডিকেল ভিসার ক্ষেত্রে কিছুটা শিথিলতা আনে। এরপর ট্যুরিস্ট ভিসাও সহজলভ্য হওয়ায় রোগীদের পাশাপাশি তাঁদের পরিবারের সদস্যদের যাতায়াতও অনেক সহজ হয়েছে। চিকিৎসকদের মতে, এতদিন পরিবারের সদস্যদের সংখ্যা নিয়ে যে বিধিনিষেধ ছিল, তা অনেকটাই কমে যাওয়ায় রোগীরা এখন চিকিৎসার জন্য বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছেন।
সূত্রের দাবি, ২৮ জুন সংশ্লিষ্ট নির্দেশিকা জারির পর মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই প্রায় ১ লক্ষ ৪০ হাজার মানুষ ভিসার জন্য আবেদন করেন। সেই আবেদন প্রক্রিয়া এগোতেই গত কয়েক দিনে পশ্চিমবঙ্গের হাসপাতালগুলিতে বাংলাদেশি রোগীর উপস্থিতি দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে।
কলকাতার একটি শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েক দিনের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে আসা রোগীর সংখ্যা প্রায় ৩৫ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৪ সালের পর এই বৃদ্ধি সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বলে দাবি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের।
পরিসংখ্যানও সেই ছবিকেই সামনে আনছে। রাজনৈতিক অস্থিরতার আগে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০০ জন বাংলাদেশি রোগী বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসতেন। পরে সেই সংখ্যা নেমে যায় প্রায় ২০-এ। এখন আবার সেই গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী।
আরও একটি খ্যাতনামা চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের সিইও জানিয়েছেন, একসময় তাঁদের হাসপাতালে প্রতিদিন প্রায় ১৫০ জন বাংলাদেশি রোগী চিকিৎসা নিতে আসতেন। কিন্তু ২০২৪ সালের পর সেই সংখ্যা ১০-এরও নিচে নেমে গিয়েছিল। সম্প্রতি কেন্দ্রের সিদ্ধান্তের পর ফের রোগীর সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছে বলে তিনি জানান। আগামী কয়েক সপ্তাহে এই সংখ্যা আরও ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বাড়তে পারে বলেও তাঁদের আশা।
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের বহু রোগী উন্নত চিকিৎসা, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এবং তুলনামূলক দ্রুত পরিষেবার জন্য দীর্ঘদিন ধরেই পশ্চিমবঙ্গকে ভরসা করে এসেছেন। তাই ভিসা প্রক্রিয়া সহজ হওয়ায় সেই পুরনো প্রবণতা আবার ফিরে আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

এই পরিস্থিতিকে ঘিরে রাজনৈতিক মহলেও আলোচনা শুরু হয়েছে। চিকিৎসা ক্ষেত্রের একাংশের মত, কেন্দ্রের এই সিদ্ধান্ত রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিষেবা ও মেডিকেল ট্যুরিজম অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হতে পারে। একই সঙ্গে প্রশাসনিক স্তরে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা মিললে আগামী দিনে পরিস্থিতি আরও উন্নত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বাংলার চিকিৎসা শিল্প গত কয়েক বছরে যে ধাক্কা সামলেছে, তার পর এই পরিবর্তন নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। তবে এখন সবার নজর একটাই প্রশ্নে—এই বাড়তি রোগীর চাপ সামলে পরিষেবার মান ধরে রাখতে পারবে কি রাজ্যের হাসপাতালগুলি? আগামী কয়েক সপ্তাহই সেই উত্তর দেবে।