আজ থেকে দেশজুড়ে জনগণনা অভিযানের প্রথম ধাপ। প্রথমবার চালু হল ডিজিটাল ‘Self Enumeration’—অনলাইনে তথ্য জমা দিলেই গণনাকর্মীর কাজ হবে আরও সহজ, তবে ভুল তথ্য দিলে হতে পারে প্রশাসনিক ব্যবস্থা।
সুষমা পাল মন্ডল। কলকাতা সারাদিন।
SIR (Special Intensive Revision) নিয়ে নাগরিকত্ব ও ভোটার তালিকা ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক এখনও থামেনি। তার মধ্যেই শনিবার, ১ আগস্ট থেকে দেশজুড়ে শুরু হল ভারতের ত্রয়োদশ জাতীয় জনগণনার প্রথম পর্ব। তবে এবারের সবচেয়ে বড় চমক—প্রথমবার নাগরিকরাই নিজেদের জনগণনার তথ্য অনলাইনে জমা দিতে পারবেন। মাত্র ১০ মিনিট সময় আর ৩৪টি প্রশ্নের উত্তর দিলেই মিলবে একটি বিশেষ ১১ সংখ্যার Self Enumeration (SE) ID।
ভারতের জনগণনার ইতিহাসে এটি একটি বড় পরিবর্তন বলেই মনে করছেন প্রশাসনিক মহল। এতদিন বাড়ি বাড়ি গিয়ে গণনাকর্মীরাই সমস্ত তথ্য সংগ্রহ করতেন। কিন্তু এবার সেই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সম্পূর্ণ ডিজিটাল Self Enumeration ব্যবস্থা। এর ফলে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নাগরিকরা নিজেরাই অনলাইনে পরিবারের তথ্য নথিভুক্ত করতে পারবেন।
এই পরিষেবা ব্যবহার করতে হলে নাগরিকদের সরকারি Self Enumeration পোর্টালে লগ-ইন করে ধাপে ধাপে তথ্য পূরণ করতে হবে। পুরো প্রক্রিয়াটি সাতটি ধাপে সম্পন্ন হবে এবং শেষে ‘Final Submit’ করলেই মোবাইল নম্বর বা ই-মেলে পৌঁছে যাবে একটি ১১ সংখ্যার SE ID। পরে গণনাকর্মী বাড়িতে এলে শুধু সেই আইডি দেখালেই দ্রুত তথ্য যাচাইয়ের কাজ শেষ করা যাবে।
তবে প্রশাসনের তরফে স্পষ্ট করে জানানো হয়েছে, অনলাইনে তথ্য জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক নয়। যাঁরা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ফর্ম পূরণ করতে পারবেন না, তাঁদের জন্য আগের মতোই বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করবেন গণনাকর্মীরা। ফলে অনলাইনে অংশ না নিলেও কোনও শাস্তি বা আইনি সমস্যার মুখে পড়তে হবে না।
এবারের জনগণনায় শুধু একটি বাড়ির সংখ্যা গোনাই লক্ষ্য নয়। প্রশাসন জানতে চাইছে একই ছাদের নিচে কয়টি পৃথক পরিবার বা গৃহস্থালি রয়েছে। অর্থাৎ, একই বাড়িতে দুই ভাই আলাদা রান্না করলে বা বাবা-মা ও ছেলের সংসার আলাদা হলে তাঁদের পৃথক পরিবার হিসেবেই গণনা করা হবে। এই তথ্য ভবিষ্যতের সরকারি পরিকল্পনা ও জনকল্যাণমূলক প্রকল্প নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
অনলাইন ফর্মে নাগরিকদের মোট ৩৪টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। সেখানে বাড়ির ধরন, মালিকানা, নির্মাণের প্রকৃতি থেকে শুরু করে পরিবারের সদস্য সংখ্যা, পানীয় জলের উৎস, বিদ্যুৎ সংযোগ, শৌচাগারের সুবিধা, রান্নার জ্বালানির ধরন—সবই জানতে চাওয়া হবে।
শুধু তাই নয়, বাড়িতে রেডিও, টেলিভিশন, কম্পিউটার, ইন্টারনেট সংযোগ, মোবাইল, সাইকেল, মোটরবাইক বা চারচাকা গাড়ি রয়েছে কি না, তাও উল্লেখ করতে হবে। প্রশাসনের দাবি, এই তথ্য দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তব চিত্র বুঝতে সাহায্য করবে এবং ভবিষ্যতের উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে।
প্রযুক্তির আরও একটি নতুন সংযোজন হল Geo-tagging। চাইলে নাগরিকরা নিজেদের বাড়ির ভৌগোলিক অবস্থানও স্যাটেলাইট মানচিত্রে যুক্ত করতে পারবেন। এর ফলে ভবিষ্যতে তথ্য যাচাই এবং প্রশাসনিক পরিকল্পনা আরও নির্ভুল হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে একটি বিষয় নিয়ে প্রশাসন কঠোর অবস্থান নিয়েছে। অনলাইনে ভুল বা মিথ্যা তথ্য জমা দিলে তা ছাড় পাবে না। গণনাকর্মীরা বাড়ি গিয়ে সমস্ত তথ্য সরেজমিনে মিলিয়ে দেখবেন। কোথাও অসঙ্গতি ধরা পড়লে সংশ্লিষ্ট বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে আনা হবে এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
এত বড় কর্মযজ্ঞ পরিচালনার জন্য কলকাতা (Kolkata Census)-কেই ভাগ করা হয়েছে ৮,১১২টি ব্লকে। প্রতিটি ব্লকে একজন করে গণনাকর্মী থাকবেন এবং তাঁর দায়িত্বে থাকবে প্রায় ১৮০ থেকে ২০০টি পরিবার। শহরে এই বিশাল জনগণনা কার্যক্রমের সার্বিক তদারকির দায়িত্বে রয়েছেন পুরপ্রশাসক তথা পুরকমিশনার।
বর্তমান পর্যায়ে মূলত বাড়ি ও পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করা হবে। এরপর ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হবে দ্বিতীয় ধাপ, যেখানে ব্যক্তিগত ও জনসংখ্যাগত তথ্য সংগ্রহের কাজ হবে। সেই পর্বে প্রথমবার সরকারি জনগণনায় রূপান্তরকামী (Transgender Census India) সম্প্রদায়ের জন্য পৃথক বিভাগ অন্তর্ভুক্ত করা হবে, যা ভারতের জনগণনা ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিটাল পদ্ধতির কারণে এবারের জনগণনা আগের তুলনায় অনেক দ্রুত, স্বচ্ছ ও নির্ভুল হতে পারে। একই সঙ্গে দেশের জনসংখ্যা, অবকাঠামো, সামাজিক অবস্থা এবং উন্নয়নের বাস্তব চিত্র সরকারের সামনে আরও স্পষ্টভাবে উঠে আসবে।
অন্যদিকে, SIR (Special Intensive Revision) ঘিরে যখন নাগরিক পরিচয় ও নথি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে, ঠিক সেই সময়ে শুরু হওয়া এই ডিজিটাল জনগণনা নতুন করে সাধারণ মানুষের কৌতূহলও বাড়িয়ে দিয়েছে। অনেকে ইতিমধ্যেই জানতে চাইছেন—ডিজিটাল স্ব-গণনার এই উদ্যোগ ভবিষ্যতের সরকারি পরিষেবা ও নীতি নির্ধারণে কতটা প্রভাব ফেলবে? এবার সেই উত্তরই খুঁজবে গোটা দেশ।