অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি রঞ্জনা দেশাইয়ের নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের কমিটি, বিবাহ থেকে উত্তরাধিকার—সব ব্যক্তিগত আইন খতিয়ে দেখবে সরকার, রাজনৈতিক মহলে শুরু জোর চর্চা।
সুষমা পাল মন্ডল। কলকাতা সারাদিন।
পশ্চিমবঙ্গে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি (UCC) কার্যকর করার পথে আরও এক বড় পদক্ষেপ নিল সরকার। বুধবারের মন্ত্রিসভার বৈঠকে ইউসিসি-র খসড়া বিল তৈরির জন্য বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠনের প্রস্তাবে সবুজ সংকেত মিলতেই রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে নতুন জল্পনা। সরকারের লক্ষ্য, কমিটির সুপারিশ হাতে পেলেই আগামী অগস্ট মাসের বাদল অধিবেশনেই বিধানসভায় ইউসিসি বিল পেশ করা।
ইউসিসি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই রাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্গনে তুমুল বিতর্ক চলছে। সেই আবহেই সরকারের এই পদক্ষেপ যে আগামী দিনে আরও বড় রাজনৈতিক আলোচনার জন্ম দেবে, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা (West Bengal Assembly)-র আসন্ন অধিবেশনকে ঘিরে এখন থেকেই বাড়ছে কৌতূহল।
গত সোমবার বিধানসভায় একাধিক বিল পেশ করার সময়ই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) ঘোষণা করেছিলেন, ইউসিসি-র খসড়া তৈরির জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হবে। সেই প্রতিশ্রুতির পর মাত্র দু’দিনের মধ্যেই মন্ত্রিসভার অনুমোদন মিলল, যা সরকারের দ্রুত পদক্ষেপেরই ইঙ্গিত বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
সরকারি সূত্রে জানা গিয়েছে, এই কমিটির নেতৃত্বে থাকবেন সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court)-এর অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি রঞ্জনা দেশাই (Ranjana Desai)। তাঁর পাশাপাশি কমিটিতে থাকবেন একজন অবসরপ্রাপ্ত আইএএস আধিকারিক, একজন আইন বিশেষজ্ঞ, একজন শিক্ষাবিদ, একজন সমাজকর্মী এবং রাজ্য সরকারের জেনারেল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিভাগের অতিরিক্ত সচিব। প্রশাসনিক সমন্বয়ের দায়িত্বও ওই অতিরিক্ত সচিবের হাতেই থাকবে।
এই কমিটির মূল কাজ হবে রাজ্যে বর্তমানে কার্যকর বিভিন্ন ব্যক্তিগত ও পারিবারিক আইন বিশদভাবে পর্যালোচনা করা। বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ, ভরণপোষণ, উত্তরাধিকার, দত্তক গ্রহণ, লিভ-ইন সম্পর্ক-সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিদ্যমান আইনি কাঠামো খতিয়ে দেখা হবে। পাশাপাশি সাংবিধানিক দিক, সামাজিক প্রভাব এবং প্রশাসনিক বাস্তবতাও বিচার করে সরকারকে সুপারিশ করবে কমিটি।
বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়েছিলেন, গুজরাত, উত্তরাখণ্ড ও অসমের পথ অনুসরণ করেই এ রাজ্যেও ইউসিসি বিল আনা হবে। তাঁর বক্তব্য, সব সম্প্রদায়ের জন্য একই দেওয়ানি আইন কার্যকর করার লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ। তবে আদিবাসী ও জনজাতি সম্প্রদায়কে এই আইনের আওতার বাইরে রাখার কথাও তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, ইউসিসি শুধুমাত্র আইনি সংস্কারের বিষয় নয়, এটি আগামী দিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যুতেও পরিণত হতে পারে। বিশেষ করে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ব্যক্তিগত আইনকে এক ছাতার তলায় আনার উদ্যোগ নিয়ে আগামী দিনে বিতর্ক আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে সরকার এখনও স্পষ্ট করেছে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বিশেষজ্ঞ কমিটির সুপারিশকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। ফলে বিলের চূড়ান্ত খসড়ায় কিছু পরিবর্তন বা নতুন প্রস্তাবও যুক্ত হতে পারে বলে প্রশাসনিক মহলের একাংশের ধারণা।
এ দিনের মন্ত্রিসভার বৈঠকে ইউসিসি-র পাশাপাশি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ‘দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল রেজিস্ট্রেশন অফ বার্থস অ্যান্ড ডেথস (অ্যামেন্ডমেন্ট) রুলস, ২০২৬’-এর খসড়াতেও অনুমোদন দিয়েছে সরকার। সংশোধিত নিয়মে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের ডিজিটাল রেকর্ড সংরক্ষণ, শংসাপত্র প্রদান, বিলম্বিত নিবন্ধনের প্রক্রিয়া, আপিল ব্যবস্থা এবং নির্ধারিত একাধিক ফর্মে পরিবর্তনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
সব মিলিয়ে, একই দিনে দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে সরকারের সক্রিয় অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে। তবে নজর এখন একটাই—বিশেষজ্ঞ কমিটি কত দ্রুত রিপোর্ট জমা দেয় এবং অগস্টের বিধানসভা অধিবেশনে সত্যিই কি ইউসিসি বিল পেশ হয়। রাজ্যের রাজনীতিতে এবার নতুন বিতর্কের দরজা খুলতে চলেছে, নাকি তৈরি হবে নতুন আইনি ইতিহাস—সেই উত্তর মিলবে খুব শিগগিরই।