সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
‘রাজ্যে কোনো লাগামছাড়া কথা বরদাস্ত করা হবে না, হবে না, হবে না। এটা জঙ্গলরাজ নয়। আপনি দুর্বল মুখ্যমন্ত্রী পেয়ে যা খুশি করেছেন, যা খুশি বলেছেন। কিন্তু মনে রাখবেন, দিন বদলেছে। আপনাকে সবক শেখানোর সময় এসেছে।’ বিধানসভার অধিবেশনে বিধায়ক হুমায়ুন কবীরের সাম্প্রতিক উস্কানিমূলক মন্তব্যের প্রেক্ষিতে চরম হুঁশিয়ারি দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সোমবার বিধানসভার ফ্লোর থেকে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিঘ্নিত করার চেষ্টা করলে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। হুমায়ুন কবীরের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে দুটি পৃথক থানায় এফআইআর দায়ের করার কথাও ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। মুখ্যমন্ত্রী জানান, ২ টো এফআইআর-এর ভিত্তিতে তদন্ত শুরু হয়েছে। রেজিনগরে কেস নম্বর ২১৯, ২২৬। বিএনএস 152, 192, 196,197, 224, 299, 351 (2), 352, 353 ধারায় হুমায়ুনের বিরুদ্ধে মামলা রুজু হয়েছে। দ্বিতীয় ঘটনাতেও শক্তিপুর থানায় বিএনএস ১৭৬/২২৬ এ মামলা রুজু রয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী বিধানসভায় ঘটনার প্রসঙ্গ উত্থাপন করে বলেন, ভরতপুরের বিধায়ক হুমায়ুন কবীর দুটি জায়গায় অত্যন্ত আপত্তিজনক, সাম্প্রদায়িক সমাজ ও রাজ্যের জন্য ক্ষতিকারক বক্তব্য রেখেছেন। পাশাপাশি চরম হুঁশিয়ারি দিয়ে দিলেন বলেন, ‘এনাফ ইজ় এনাফ’। হুমায়ুনের বিরুদ্ধে কি অভিযোগ রয়েছে সেই সঙ্গে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বিধানসভায় দাঁড়িয়ে হুমায়ুনের বক্তব্য পাঠ করেন মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘২৬ জুন দুপুরে হুমায়ুন কবীর কাশীপুরের রেজিনগরে তাঁর দলীয় কর্মসূচিতে বলছেন, “অনামিকা ঘোষ ভোটে হেরে মনে করছেন আমি এমএলএ। এখানে ভোটে হেরে বিজেপি মনে করছে, আমি এমএলএ। এখানে এখন আস্ফালন করে বেরাচ্ছে। আমি শুভেন্দু অধিকারীকে বলেছি যে, আপনি ভোটে জিতেছেন, আপনার দল জিতেছে, ভালো কথা। কিন্তু মুর্শিদাবাদে আস্ফালনটা একটু কম করবেন। আমি যেদিন ময়দানে মুসলমানদের নিয়ে নেমে যাব না, সেদিন এমন স্যাটা ভাঙা মার শুরু করবে যে, আপনাদের পতাকা বহন করার লোক থাকবে না। আমাদের বহরমপুরে জেল খাটা আছে। ৫০০০ হাজার লোককে আপনি বহরমপুর সেন্ট্রাল জেলের যা আয়তন, তাতে ৪৭০০ বা ৪৮০০-র বেশি লোক ধরে না। লাখে লাখে লোক রাস্তায় নিয়ে নামাব। আর স্যাটা ভাঙা মার দেব আর জেলে যাব। ক’দিন জেলে আটকে রাখতে পারবেন?’
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘এই দুটো ঘটনার পর মনে হয়েছে, এনাফ ইজ় এনাফ। সময় এসেছে এই ধরনের লোককে শিক্ষা দেওয়ার। এখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্য়মন্ত্রী নন। আগে দুর্বল মুখ্যমন্ত্রী পেয়ে যা খুশি বলেছেন, যা খুশি করেছেন। আমি আশ্বস্ত করছি, এত বড় ক্ষমতা আপনাকে কেউ দেয়নি।’ হুমায়ুন কবীর হঠাৎ করে কেন এই ধরনের সাম্প্রদায়িক উস্কানিমূলক বক্তব্য রাখতে শুরু করেছেন তার পেছনে নির্দিষ্ট এজেন্ডা রয়েছে বলে অভিযোগ করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আপনি কেন এসব করছেন আমি জানি। আপনার প্রথম এজেন্ডা ছিল ভরতপুর-রেজিনগর-নওদায় সব নির্বাচিত পঞ্চায়েত ভেঙে আপনার পার্টিতে নিয়ে যাওয়া। আপনি সেটা করতে পারছেন না। দ্বিতীয়, ২টো সিটে জিতেছেন। নিয়ম মেনে রেজিনগরে রিজাইন করেছেন। ২-৩ মাসের মধ্যে উপনির্বাচন হবে, আপনি আপনার ছেলেকে জিতাতে চাইছেন। ৭২ শতাংশ মুসলিম ভোট রয়েছে। আর সেটাকে টানতেই এই খেলাটা খেলছেন। কান খুলে শুনে রাখুন, এইভাবে ধমক-হুমকি, বেপরোয়া, লাগামছাড়া কথা বলতে দেব না—দেব না—দেব না। সন্দেশখালিতে একজন ছিল, জীবনতলার গুন্ডা,আরেকজন পুষ্পা- এমন ঝুঁকেছেন, খালি পায়ে হাফ প্যান্ট পরে ওঠবোস করতে করতে যাচ্ছেন। এই ধরনের কথা বলার আগে এরপর থেকে ২৫ বার ভাবুন।’

পাল্টা হুমায়ুনের হুঁশিয়ারি
‘আমার প্রার্থীকে জেতাতে গিয়ে আমাকে কেউ ঢিল ছুঁড়লে আমি তাঁকে রসগোল্লা ছুঁড়ব না।’ সোমবার রাজ্য বিধানসভায় দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী আম জনতা উন্নয়ন পার্টির বিধায়ক হুমায়ুন কবীরের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়ার পর এভাবেই পাল্টা হুঙ্কার দিলেন হুমায়ুন। সোমবার বিধানসভায় দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী পষ্টাপষ্টিই বলেন, ‘এই ধরনের লোককে সবক শিখানোর সময় এসে গেছে।’ প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর প্রসঙ্গ টেনে শুভেন্দু এও বলেন, ‘আপনাকে পরিষ্কার বলছি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখন মুখ্যমন্ত্রী নন। আপনি দুর্বল মুখ্যমন্ত্রী পেয়ে এতদিন যা খুশি করেছেন, যা খুশি বলেছেন। কিন্তু এখন আর তা চলবে না।’
মুখ্যমন্ত্রী তথা রাজ্যের পুলিশ মন্ত্রী যে ফাঁপা কথা বলেননি, তা পরিষ্কার হয়ে গেছে পুলিশি পদক্ষেপেও। হুমায়ুনের বিরুদ্ধে জোড়া এফআইআর দায়ের করেছে পুলিশ। সূত্রের দাবি, এই জোড়া এফআইআরের পর হুমায়ুনের গ্রেফতারের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সম্ভবত সেটা আন্দাজ করতে পারছেন হুমায়ুন। এদিন সকালে বিধানসভায় থাকলেও দুপুরের পর থেকেই তাঁর আর নাগাল পাওয়া যায়নি। শক্তিপুর থানার এফআইআর অনুযায়ী, ২৭ জুন সন্ধ্যা ৬টা ৪০ মিনিট নাগাদ একটি ফেসবুক ভিডিও পুলিশের হাতে আসে। অভিযোগ, সেই ভিডিওতে হুমায়ুন কবির পুলিশ প্রশাসনের বিরুদ্ধে ‘অপমানজনক, মানহানিকর, উস্কানিমূলক এবং ইচ্ছাকৃতভাবে অবমাননাকর’ মন্তব্য করেছেন। পরে প্রাথমিক তদন্তে জানা যায়, ৮ মে শক্তিপুর থানার গড়দুয়ারা ঘাট সংলগ্ন বিজয় সমাবেশে তিনি ওই বক্তব্য রেখেছিলেন। পুলিশের দাবি, ওই বক্তব্য জনশৃঙ্খলা নষ্ট করতে পারে এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতেও প্রভাব ফেলতে সক্ষম।
শক্তিপুর থানার মামলায় হুমায়ুন কবীরের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার (বিএনএস) একাধিক ধারায় মামলা রুজু হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত করা, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়ানো, মানহানি, ইচ্ছাকৃত অপমান এবং হুমকির মতো অভিযোগ। এফআইআরে উল্লেখ রয়েছে, তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এক সাব-ইনস্পেক্টরকে এবং মামলার উপর নজর রাখবেন এসডিপিও ও সার্কেল ইন্সপেক্টর।
বিধানসভা চত্বরে দাঁড়িয়ে হুমায়ুন কবীর বলেন, ‘আমি বিজেপির বিরুদ্ধে বলেছি। নবাগত বিজেপিরা আমাকে আক্রমণ করেছেন। আমার বাড়ির কাছে গিয়ে, সেখানে পুলিশের নিরাপত্তা নিয়ে গিয়ে আমাকে আক্রমণ করেছেন। আমি রাজনৈতিকভাবে তাঁদের আক্রমণ করব। তিনি বলতেই পারেন। তিনি বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। তিনি কী বলছেন সেই কথার বিরোধিতা তো আমি করতে পারব না। তাঁর স্বাধীনতা আছে, বলছেন। আমি রাজনীতির কর্মী হিসাবে, আমার যে উপনির্বাচন হবে, সেখানে আমার প্রার্থীকে জেতাতে গিয়ে আমাকে কেউ ঢিল ছুঁড়লে আমি তাঁকে রসগোল্লা ছুঁড়ব না। বাংলার নতুন মুখ্যমন্ত্রী বাংলার ১১ কোটি মানুষকে সুশাসন দেন, সেই প্রত্যাশা নিয়ে আমরাও পরিবর্তন চেয়েছিলাম। পরিবর্তনের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন। কিন্তু, সারা রাজ্যের সঙ্গে মুর্শিদাবাদের রেজিনগরকে যদি আলাদা ট্রিটমেন্ট করেন, নওদাকে যদি আলাদা ট্রিটমেন্ট করেন, বেলডাঙাকে যদি আলাদা ট্রিটমেন্ট করেন…হবে। জেলে যাব। কী আছে?’