সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
‘তারাতলার ওই সাইটে কোনও নজরদারিই হয়নি। তবে নিশ্চিন্তে থাকুন, এই ঘটনার নেপথ্যে যাঁরা রয়েছেন, তাঁদের কাউকেই রেয়াত করা হবে না।’ তারা তলায় নির্মীয়মান গোডাউনের ছাদ ভেঙে পড়ে ১৫ শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় এবারে কঠোরতম শাস্তির ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। শুক্রবার ঋষি বঙ্কিমচন্দ্রের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করার পরে ময়দানে পিডব্লিউডি টেন্টে বসে তারাতলার ঘটনার প্রেক্ষিতে কঠোরতম ব্যবস্থা গ্রহণ করার হুঁশিয়ারি দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ‘গোডাউন নির্মাণের প্ল্যান পাশ করা ছিল। নিয়ম অনুযায়ী, পুরো কাজের ওপর সুনির্দিষ্ট নজরদারি চালানোর কথা ছিল নির্মাণকারী সংস্থার। কিন্তু তারা সেই গুরুদায়িত্ব পালন করেনি। প্ল্যানার ও আর্কিটেক্টের ওপর যে নজরদারির দায়ভার ছিল, তা তারা অন্য কারও ওপর চাপিয়ে দিয়েছিল।’ গত বুধবার বেলা ঠিক ১২টা বেজে ৭ মিনিটে তারাতলার ওই নির্মীয়মাণ গোডাউনটি হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে। ঘটনার আকস্মিকতা কাটিয়ে তড়িঘড়ি উদ্ধারকাজে নেমে পড়ে কলকাতা পুলিশ, দমকল বাহিনী, এনডিআরএফ এবং ভারতীয় সেনা। কংক্রিটের স্তূপের নীচে আটকে পড়া শ্রমিকদের দ্রুত ও জীবিত বের করে আনতে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও উন্নত যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয়। কলকাতা পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ধ্বংসস্তূপ থেকে এখনও পর্যন্ত ১৫ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় গুরুতর জখম হয়েছেন আরও অন্তত ৩৩ জন। তাঁদের স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা চলছে। মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, শুক্রবারের মধ্যেই সমস্ত ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে উদ্ধারকাজ সম্পূর্ণ গুটিয়ে ফেলা হবে। এই ঘটনায় পুলিশি তদন্তের গতি বাড়িয়ে ইতিমধ্যেই ৫ জন অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
গত বুধবার তারা তলায় নির্মীয়মান গোডাউনের ছাদ ঢালাইয়ের কাজের দায়িত্ব যে অয়ন ট্রেডার্স এর হাতে ছিল সেই সংস্থাকে ব্ল্যাকলিস্টেড করার ঘোষণা করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘এটা তো মাত্র শুরু। এইভাবে বেআইনি ও দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে যাঁরা কাজ করছেন, পুরসভার তরফে সেই সব সংস্থাকেই আগামী দিনে কালো তালিকাভুক্ত করা হবে।’ সেই সঙ্গেই কলকাতা বা তার পার্শ্ববর্তী এলাকায় আবাসন কিংবা বহুতলের প্ল্যান নিয়ে কোনও নাগরিক প্রতারিত হয়ে থাকলে, তাঁদের অবিলম্বে নিকটবর্তী থানায় অভিযোগ জানানোর পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। পুলিশকে দ্রুত কড়া পদক্ষেপ বা অ্যাকশন নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ দিনের মঞ্চ থেকে পোস্তা এবং গার্ডেনরিচের পুরনো বিপর্যয়ের প্রসঙ্গ টেনে পূর্বতন তৃণমূল কংগ্রেস সরকারকেও তীব্র নিশানা করেন মুখ্যমন্ত্রী।
বাড়লো বাড়ির প্ল্যান অডিটের এলাকা
তারাতলা বিপর্যয়ের পরই সব নির্মাণ বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। অডিটের পরই হবে নির্মাণকাজ শুরু করা যাবে। অডিটের আওতায় কোন কোন জায়গা রয়েছে, তাও জানিয়েছেন। এবার সেই তালিকায় যুক্ত হল আরও তিনটে জায়গা। অডিটের আওতায় রয়েছে দক্ষিণ দমদম, বরানগর, কামারহাটি পুরসভা। বেআইনি নির্মাণ নিয়ে প্রথম থেকে জ়িরো টলারেন্স নীতি নিয়েছে রাজ্য সরকার। এবার মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়েছেন, ‘বাড়ির প্ল্যানে কোনও দুর্নীতি হলে এফআইআর করুন। পদক্ষেপ করা হবে। তারাতলার ঘটনায় এখনও উদ্ধারকাজ চলছে। এনডিআরএফ নেতৃত্ব দিচ্ছে, বাকিরা সাহায্য করছে। আমার সঙ্গে কথা হয়েছে। তাঁরা জানিয়েছেন, আবহাওয়া ঠিক থাকলে আজ রাতের মধ্যেই উদ্ধারকাজ শেষ হবে।’ কিভাবে এই অডিট এর কাজ হবে তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী জানান, ‘নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় কমার্শিয়াল বিল্ডিং ৩১ জুলাই পর্যন্ত অডিট করছি। রেসিডেন্সিয়াল ক্ষেত্রে সংস্কারের বাইরে থাকছে। নির্মীয়মাণ বিল্ডিংয়ে অডিটের টিম তৈরি হয়েছে। অডিটের পর ছাড়পত্র পেলে তবেই নির্মাণকাজ শুরু করা হবে। তিন মাসের মধ্যে সব বহুতলের ফায়ার অডিট সম্পূর্ণ করতে হবে।’

বঙ্কিমচন্দ্রকে শ্রদ্ধার্ঘ মুখ্যমন্ত্রীর
সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ১৮৯ তম জন্মজয়ন্তীতে কলেজ স্ট্রিট থেকে পশ্চিমবঙ্গের জাতীয় মানের বন্দেমাতরম মিউজিয়াম তৈরির ঘোষণা করলেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। কেন্দ্রে মোদি সরকারের উদ্যোগে একদিকে যেমন বঙ্কিমচন্দ্রের রচনা বন্দেমাতরম জাতীয় গানের স্বীকৃতি পেয়েছে পাশাপাশি রাজ্যের তৃণমূলের সরকার থাকাকালীন বঙ্কিমচন্দ্র এবং তার রচিত বন্দেমাতরম তার প্রাপ্য সম্মান পায়নি বলে অভিযোগ করেন মুখ্যমন্ত্রী। শুভেন্দু অধিকারী বলেন, বিগত সরকার ছিল তোষণের সরকার। রাজ্যে বর্তমানে রাষ্ট্রবাদী সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এবার সব কাজ হবে। গত বছর কলেজ স্ট্রিটের এই বাড়িতে ঢুকতে বাধা পেয়েছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হয়ে সেখানেই বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্মজয়ন্তী পালন করলেন তিনি। তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তর এবং কলকাতা পুরসভার যৌথ উদ্যোগে আজ কলেজ স্ট্রিটে সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বাসভবনে তাঁর ১৮৯ তম জন্মজয়ন্তী পালন করা হয়। এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি বঙ্কিমচন্দ্রের প্রতিকৃতিতে মাল্যদান করে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করেন। শুভেন্দু জানান, এই প্রথমবার রাজ্য সরকার কলেজ স্ট্রিটে বঙ্কিমচন্দ্রের এই বাড়িতে কোনও অনুষ্ঠান পালন করছে। এরপর তৃণমূলের দুর্নীতি, পরিবারবাদের বিরুদ্ধে সরব হন তিনি। তৃণমূল নেতাদের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তাঁর সাফ কথা, ‘বঙ্কিমচন্দ্রের স্মৃতি বিজরিত বাড়িতে কোনও চোর, ডাকাত, লম্পট, চিটিংবাজদের সম্পর্কে আলোচনা না করাই ভালো। এর জন্য অন্য জায়গা আছে। আগে আমাকে এখানে ঢুকতে দেয়নি। বন্দে মারতরমের ১৫০ বছরে এখানকার রাস্তা খুঁড়ে দিয়েছিল।’