ক্ষমতায় ফেরা আর সম্ভব নয়, দাবি মুখ্যমন্ত্রীর; তৃণমূলের ১৫ বছরের শাসন, তোষণ, পরিবারতন্ত্র ও দুর্নীতি নিয়ে একের পর এক তোপ
সুহানা বিশ্বাস। কলকাতা সারাদিন।
কলকাতা: রাজ্য বিধানসভার অধিবেশন মঙ্গলবার কার্যত রণক্ষেত্রের চেহারা নিল। আর সেই লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (West Bengal Chief Minister Suvendu Adhikari) এবং প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)। রাজ্যপালের ভাষণের উপর জবাবি বক্তব্য রাখতে উঠে শুভেন্দু যে ভাষায় আক্রমণ শানালেন, তা ঘিরে রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে তুমুল আলোচনা।
“আমি জানি, আপনারা আর ফিরতে পারবেন না। ওই অধ্যায় শেষ হয়ে গিয়েছে”— বিধানসভার মেঝেতে দাঁড়িয়ে এই মন্তব্য করতেই মুহূর্তে চড়ে যায় রাজনৈতিক উত্তাপ। শাসক-বিরোধী সংঘাতের আবহে শুভেন্দুর বক্তব্য যেন শুধু সমালোচনা নয়, বরং ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়েও এক বড় বার্তা।
মঙ্গলবার রাজ্য বিধানসভায় রাজ্যপালের অভিভাষণ নিয়ে বিরোধীদের জবাব দিতে ওঠেন শুভেন্দু। সেখানে আগাগোড়া পূর্বতন সরকারকে নিশানা করেন তিনি। বেঙ্গল গ্লোবাল বিজনেস সামিটের জন্য সরাসরি ফিকিকে ৩২৪.৭৩ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ তোলেন। বলেন, “প্রাক্তন মুখ্য়মন্ত্রী দিয়েছেন। আপনি এটা করতে পারেন? পারেন দিতে? সহযোগিতা করুন। কাজ করতে দিন। আমরা এই রাজ্যকে দাঁড় করাতে চাই।” (Mamata Banerjee)
নির্বাচনে পরাজয়ের পর ভোট পরবর্তী অশান্তির প্রতিবাদে সম্প্রতি ওয়াই চ্যানেলে ধর্নায় বসেন মমতা। সেই প্রসঙ্গ টেনে বলেন, “প্রাক্তন মুখ্য়মন্ত্রী বললেন, রানি রাসমণিতে বসব। পুলিশ আমাকে জিজ্ঞেস করল। আমি পুলিশমন্ত্রী। তিনি বললেন, ‘স্যর কী করব?’ আমি বললাম, পারমিশন দেবেন। ওয়াই চ্যানেলে বসতে বলুন। যত ক্ষণ খুশি বসতে বলুন। করুন, রোজ মিছিল করুন। নো প্রবলেম। কিন্তু আসতে পারবেন না। আসতে আর কোনও দিন পারবেন না। আমি জানি। ৩৪ বছরের কমিউনিস্টদের অত্যাচার ভেঙে ২০১১-র পরিবর্তনেও আমি রাস্তায় ছিলাম। আর ২০২৬-এ আপনাদের তাড়ানোর কাজেও রাস্তায় ছিলাম আমি। আমি জানি, আপনারা আর আসতে পারবেন না। ওই চ্যাপ্টার ক্লোজ হয়ে গিয়েছে।”
শুভেন্দু আরও বলেন, “পুষ্পা ঝুকেগা নহি! পুষ্পা মার্কেটেই নেই? মার্কেট ছেড়ে ভেগে গিয়েছে। জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে। কাদের হাতে দল গিয়েছিল? যারা একটা সময় কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে লড়েছিল…তার পর আপনারা লাল চুল, কানে দুল, তার নাম যুব তৃণমূল। যা পরিণতি হওয়ার, তা হয়েছে।”
মমতাকে আক্রমণ করতে গিয়ে ফের তোষণের অভিযোগ তোলেন শুভেন্দু। নিজের পরিবার ছাড়া প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী কারও কথা ভাবেন না বলেও দাবি করেন। শুভেন্দুর বক্তব্য, “মহাকুম্ভকে মৃত্যুকুম্ভ বলেছিলেন, তার বদলা নিয়েছে বাংলা। ২০২৪ সালের ২২ জানুয়ারি…সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে রামমন্দির তৈরি হয়েছে। সরকারি টাকায় হয়নি। ত্রাণ সংগ্রহ করা হয়েছে। আমরা যারা হিন্দবধর্মে আস্থাবান. তাঁরা দিয়েছি। একজন প্রাক্তন মুখ্য়মন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে থেকে মিছিল করছেন রামমন্দির মানি না, মানব না! তার উত্তর বাংলার জনগণ দিয়েছেন। আমি গিয়ে খাতা খুলে দেখি, দিঘার জগন্নাথ ধাম কালচারাল সেন্টার লেখা আছে। আপনি চালিয়ে গেলেন গজা, প্যাঁড়া। কেউ বিশ্বাস করবে! সরকারি টাকায় হয়! তার উন্নয়ন করতে পারেননি। রাস্তা, আলো করে দিন! যাতায়াতের ব্যবস্থা, রেল স্টেশন করে দিন! যারা তীর্থযাত্রী যাবে, বসার জায়গা করে দিন। পার্ক বানিয়ে দিন। আমরা ধাম শব্দ তুলে দিয়েছি। আপনি বদলে দিতে পারেন না চার ধামের… এত ক্ষমতা কেউ দেয়নি আপনাকে। তাই নিজে নন্দীগ্রামেও হেরেছেন, এবার ভবানীপুরেও হেরেছেন। নিজের বুথ মিত্র ইনস্টিটিউশন। চারটি বুথে হেরেছেন। যিনি বুথে হারেন, তাঁকে জননেত্রী মানতে হবে! এখান থেকে আমাকে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, ‘সবাই হেরেছো’। আজ আপনি বাড়িতে বসে আমার কথা শুনছেন। আমি বলেছিলাম, উত্তর ২০২৬-এ দেব। জনগণ উত্তর দিয়ে দিয়েছে।”
এদিন অধিবেশনের শেষ দিকে ঋতব্রত-তৃণমূলের বিধায়করা ওয়াকআউট করেন। সেই সময় কালীঘাট শিবিরের বিধায়ক হিসেবে পরিচিত কুণাল ঘোষ তাঁদের কটাক্ষ করেন। বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধেও যাতে সব অভিযোগ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয় আবেদন জানান শুভেন্দুর কাছে। সেই সময় শুভেন্দু বলেন, “মাত্র দেড় মাসে ৮০-র মধ্যে ৬২ বিধায়ক নেই। ভারতে হয়নি। আপনাদের এই দশার জন্য আমরা দায়ী নই। আপনারা নিজেরাই দায়ী। নিজেদের ঘর আগে সামলান। এই খণ্ডচিত্র বাংলা দেখছে। এরকম অবস্থা কোনও দলের হয়নি। এই করুণ পরিণতি হয়েছে দম্ভ, অহঙ্কার, স্বেচ্ছাচারিতা, ঔদ্ধত্য, তোষণ, পরিবারতন্ত্র, সীমাহীন দুর্নীতির জন্য। আপনারা আর উঠে দাঁড়াতে পারবেন না।”