শোভন গায়েন। কলকাতা সারাদিন।
বিশ্বকর্মা পুজোর ছুটি বাতিল করে ইদে দু’দিন ছুটি! নোটিস ঘিরে বিতর্ক শুরু হতেই কলকাতা পুরসভার শিক্ষা বিভাগের এক আধিকারিককে শো কজ় করল কলকাতা পুরসভা। অভিযোগ, ওই আধিকারিক কর্তৃপক্ষকে না-জানিয়েই ওই নোটিস ছেড়ে দিয়েছিলেন। কেন তিনি সে কাজ করেছিলেন, তিন দিনের মধ্যে তার কারণ দর্শাতে বলা হয়েছে ওই আধিকারিককে। পাশাপাশি অবিলম্বে এই বিতর্কের অবসান ঘটাতে বিতর্কিত বিজ্ঞপ্তি বাতিল বলে ঘোষণা করেছেন কলকাতা পৌরসভা। প্রসঙ্গত, কলকাতা পুরসভায় সম্প্রতি একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ রয়েছে, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ বিশ্বকর্মা পুজোর যে ছুটি ছিল, সেই ছুটিটার কলকাতা পুরসভার অন্তর্গত সমস্ত স্কুলগুলিতে বাতিল করা হয়েছে। পরিবর্তে ৩১ মার্চ ও ১ এপ্রিল, ২০২৫ ছুটি দেওয়া হয়েছে।
পুরসভা সূত্রে খবর, কলকাতা পুর এলাকায় হিন্দি এবং উর্দুভাষী স্কুলগুলির জন্য ছুটির যে তালিকা প্রকাশ করা হয়েছিল, তাতে বিশ্বকর্মা পুজোর ছুটি বাতিল করে দু’দিন ছুটি দেওয়া হয়েছিল ইদে। পুরসভার শিক্ষা বিভাগের চিফ ম্যানেজার সিদ্ধার্থশঙ্কর ধাড়া সেই নোটিস জারি করেছিলেন। বিষয়টি নিয়ে বিতর্কের মুখে ওই আধিকারিককে শো কজ় করা হয়। পুর কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, তাঁরা ওই নোটিস সম্পর্কে কিছুই জানতেন না। নোটিসটি ইতিমধ্যে বাতিলও করা হয়েছে। পুর কমিশনার ধবল জৈন বিবৃতি দিয়ে বলেন, ”ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা না করেই ওই নোটিস জারি করা হয়েছিল। কলকাতা পুরসভা ওই নোটিস সম্পর্কে কিছুই জানত না। ওই নোটিস বাতিল করা হয়েছে।”
কলকাতা পুরসভার ছুটি বিতর্কে মেয়র ফিরহাদ হাকিম বলেন, “এই ধরনের বিজ্ঞপ্তি জারি করা উচিতই না। কমিশনারের অনুমতি কেন নেয়নি, সেটা আমি স্পষ্টভাবে জিজ্ঞাসা করতে বলেছি। এরকম কোনই ছুটি বিজ্ঞপ্তি হয় না। সরকারি ছুটি আমাদের দেশের ছুটি, সরকারি ক্যালেন্ডারে যা ছুটি, সেটাই আমাদের ছুটি। সুতরাং এখানে আলাদা করে কোনও নোটিফিকেশন বানানোর কোনও মানেই হয় না। আমি বাংলায় সব সময়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে বিশ্বাস করি। সেই কারণে আমরা সব ধর্ম উৎসবেই আমরা আনন্দ করি।”
এই বিষয়টি নিয়ে কলকাতা পুরসভার শিক্ষা বিভাগের মেয়র পারিষদ সন্দীপন সাহার বক্তব্য, “আমরা শোকজ করেছি, তিনি এরকম একটা সার্কুলার কীভাবে বার করলেন? এটা তাঁর এক্তিয়ার বহির্ভূত। এরকম কোথাও কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি। ডিসিপ্লিনারি অ্যাকশন তাঁর বিরুদ্ধে নেব। আমার বা মেয়রের কোনও অ্যাপ্রুভাল সিগনেচার কোথাও পাবেন না।”
বিতর্কিত বিজ্ঞপ্তি সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ্যে এনে তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন রাজ্য বিজেপির সাধারণ সম্পাদক জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়। ভিডিয়ো বার্তায় এই বিষয়টিকেই সামনে এনে বিজেপি নেতার আক্রমণ, “পশ্চিমবঙ্গকে বাংলাদেশ তৈরি করা হচ্ছে।” সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করে জগন্নাথ দাবি করেছেন, ‘শিবরাত্রির সকালে বাঙালির জানা দরকার পশ্চিমবঙ্গটা পশ্চিমবঙ্গই আছে না পশ্চিম বাংলাদেশ হয়ে গিয়েছে। কলকাতার মেয়র জনাব ফিরহাদ সোহরাবর্দি হাকিম, যিনি নিজের বিধানসভা কেন্দ্রকে মিনি পাকিস্তান বলেন। দাওয়াত এ ইসলামের কথা বলেন, ভিনধর্মীদের ইসলাম কবুল করার কথা বলেন। মুসলমানদের জনসংখ্যা বাড়িয়ে সংখ্যাগুরু হওয়ার কথা বলেন, তাঁর আমলে এবার কলকাতা শহরে বিশ্বকর্মার ছুটি বাতিল করা হল। এবং বিশ্বকর্মার ছুটি বাতিল করে কলকাতা পুরসভার স্কুলগুলিতে ইদ – উল – ফিতরের ছুটি ২ দিন করা হল। সারা ভারতে ইদ – উল – ফিতরের ছুটি ১ দিন হয়। কিন্তু কলকাতা পুরসভা যেহেতু জনাব ফিরহাদ সোহরাবর্দি হাকিমের দ্বারা শাসিত তাই এখানে ২ দিন করা হল।’ ভিডিয়োতে জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় আরও বলেন, ‘কলকাতা পুরসভার শিক্ষা দফতরের প্রকাশিত এই বিজ্ঞপ্তি প্রত্যেকটি বাঙালি সনাতনীর হৃদয়ে ঘা দেবে। মনে অশান্তের সৃষ্টি করেন। যে রাজ্যের মুখিয়া অমৃতকুম্ভকে মৃত্যুকুম্ভ বলেন তাঁর প্রিয় ববি বিশ্বকর্মা পুজোর ছুটি বাতিল করে ইদের ছুটি ২ দিন বাড়াবে সেটাই তো স্বাভাবিক। সনাতনী বাঙালি ভাবুন আমরা কোন পথে চলেছি। ছাব্বিশে বিদায় করুন, নইলে আপনাকে এই বাংলা থেকে বিদায় হতে হবে।’
এই বিজ্ঞপ্তি নিয়ে সিপিএম নেতা তথা আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য বলেন, “ধর্মীয় অনুষ্ঠান উপলক্ষে ছুটি হবে কেন? ছুটি হবে জাতীয় অনুষ্ঠান মেনে। যদি বুঝতাম ভাষা দিবসে ছুটি দিয়েছে, কিংবা স্বাধীনতা দিবসে দুদিন ছুটি বাড়ানো হয়েছে, তা না করে ধর্মীয় অনুষ্ঠানে ছুটি দেওয়া হচ্ছে।”