৯৯% ভারতীয় পণ্যে যুক্তরাজ্যে শুল্কমুক্ত প্রবেশ, ভারতে ৯০% ব্রিটিশ পণ্যে কমছে শুল্ক—দুই দেশের বাণিজ্যে নতুন অধ্যায়ের সূচনা
সুষমা পাল মন্ডল। কলকাতা সারাদিন।
নয়াদিল্লি/লন্ডন: ভারত (India) ও যুক্তরাজ্যের (United Kingdom) অর্থনৈতিক সম্পর্কে শুরু হল এক নতুন অধ্যায়। বহু প্রতীক্ষিত ভারত-ব্রিটেন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (UK-India Free Trade Agreement) মঙ্গলবার, ১৫ জুলাই থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয়েছে। দুই দেশের সরকারই এই চুক্তিকে গত কয়েক দশকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক সাফল্য হিসেবে দেখছে।
এই চুক্তি কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ব্যবসা, বিনিয়োগ, উৎপাদন, পর্যটন এবং ভোক্তা বাজার—সব ক্ষেত্রেই নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে গেল। বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এর প্রভাব শুধু দুই দেশের অর্থনীতিতেই নয়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও স্পষ্টভাবে দেখা যাবে।
বর্তমানে ভারত ও ব্রিটেন-র দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৪৮ বিলিয়ন পাউন্ড। নতুন চুক্তির ফলে সেই অঙ্ক আরও দ্রুত বাড়বে বলে আশাবাদী দুই দেশই। সবচেয়ে বড় সুবিধা মিলবে আমদানি-রপ্তানিতে। কারণ, এখন থেকে বিপুল সংখ্যক পণ্যে শুল্ক কমবে বা পুরোপুরি উঠে যাবে।
চুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যে প্রবেশ করা ৯৯ শতাংশ ভারতীয় পণ্য কার্যত শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। অন্যদিকে ভারতে আসা ৯০ শতাংশ ব্রিটিশ পণ্যে শুল্ক উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হয়েছে। ফলে দুই দেশের বাজারে পণ্যের দাম কমার পাশাপাশি ব্যবসায়িক লেনদেনও আরও সহজ হবে।
এই ঐতিহাসিক মুহূর্তকে স্মরণীয় করে রাখতে মুম্বই (Mumbai)-এ ব্রিটিশ ডেপুটি হাই কমিশনে একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের (British Airways) একটি বিমানে যুক্তরাজ্য থেকে বিশেষভাবে আনা হয় একাধিক ব্রিটিশ পণ্য। এর মধ্যে ছিল প্রসাধনী, খাদ্যসামগ্রী এবং বিভিন্ন পানীয়, যেগুলি নতুন চুক্তির ফলে কম শুল্কের সুবিধা পাবে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন দক্ষিণ এশিয়ার জন্য ব্রিটেনের ট্রেড কমিশনার হারজিন্দর কাং (Harjinder Kang)। তিনি বলেন, “এটি ভারত ও যুক্তরাজ্যের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। এই চুক্তি কার্যকর হওয়ার প্রথম দিন থেকেই ব্যবসা ও সাধারণ মানুষ সরাসরি এর সুফল পাবেন। বাণিজ্য হবে আরও দ্রুত, সহজ এবং সাশ্রয়ী।”
ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের ভারতীয় শাখার জেনারেল ম্যানেজার ডেভিড রাইট (David Wright)-ও এই চুক্তিকে দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর কথায়, ভারত ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাজার। বর্তমানে প্রতি সপ্তাহে ৬৩টি ফ্লাইট পরিচালনা করা হলেও গ্রীষ্মের শেষে তা বেড়ে ৭০-এ পৌঁছবে। এতে ব্যবসা, পর্যটন এবং সাংস্কৃতিক যোগাযোগ আরও শক্তিশালী হবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই চুক্তির সুবিধা শুধু বড় শিল্পেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। অটোমোবাইল (Automobile), উৎপাদন শিল্প (Manufacturing), ভোগ্যপণ্য (Consumer Goods), সৃজনশীল শিল্প (Creative Industries) এবং চিকিৎসা প্রযুক্তি (Medical Technology)-সহ একাধিক ক্ষেত্রে নতুন বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং রপ্তানির সুযোগ তৈরি হবে।
দুই দেশের সরকার ইতিমধ্যেই এই সাফল্য উদযাপনের জন্য নয়াদিল্লি (New Delhi), মুম্বই (Mumbai), বেঙ্গালুরু (Bengaluru) এবং লন্ডনের (London) ল্যাঙ্কাস্টার হাউসে একাধিক ব্যবসায়িক অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করেছে। সেখানে শিল্পপতি, বিনিয়োগকারী এবং ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন।
দীর্ঘমেয়াদে এই চুক্তির অর্থনৈতিক প্রভাবও যথেষ্ট বড় হতে পারে। সরকারি অনুমান অনুযায়ী, প্রতি বছর দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য প্রায় ২৫.৫ বিলিয়ন পাউন্ড পর্যন্ত বাড়তে পারে। একইসঙ্গে ভারতের জিডিপি প্রায় ৫.১ বিলিয়ন পাউন্ড এবং যুক্তরাজ্যের জিডিপি ৪.৮ বিলিয়ন পাউন্ড পর্যন্ত বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বিশ্ব অর্থনীতির অনিশ্চয়তার মধ্যে এই চুক্তিকে দুই দেশের জন্য একটি কৌশলগত পদক্ষেপ বলেই মনে করছেন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশেষজ্ঞরা। এখন নজর থাকবে, এই নতুন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবে কত দ্রুত শিল্প, ব্যবসা ও সাধারণ মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। আজ শুরু হল নতুন অধ্যায়—এবার দেখার, এই ঐতিহাসিক চুক্তি ভবিষ্যতের অর্থনীতির মানচিত্র কতটা বদলে দিতে পারে।