সুহানা বিশ্বাস। কলকাতা সারাদিন।
‘আমি এমন ভারতের নাগরিক, যেখানে একদিকে ‘এক ভারত, শ্রেষ্ঠ’ ভারতের প্রচার হয়, আর অন্য দিকে মাতৃভাষা কাউকে সন্দেহের পাত্র করে তোলে। বাংলায় কথা বললে কেউ বাংলাদেশি হয়ে যান, মাছ খেলে মুঘল বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়।’ এভাবেই আজ লোকসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে কেন্দ্রের মোদি সরকারের বিরুদ্ধে একের পর এক বিস্ফোরক অভিযোগ করলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক তথা ডায়মন্ডহারবারের সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।
বাজেট অধিবেশনে বক্তৃতা করতে গিয়ে ‘টু ইন্ডিয়া’ তত্ত্ব তুলে ধরেন অভিষেক, যে কবিতা পাঠ করে দেশের উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের বিরাগভাজন হয়েছিলেন কৌতুকশিল্পী বীর দাস। নিজের অবস্থান বোঝাতে গিয়ে এদিন, সেই কবিতাকেই হাতিয়ার করেন অভিষেক। ২০২১ সালে আমেরিকার কেনেডি সেন্টারে যে কবিতা পাঠ করে খবরের শিরোনামে উঠে আসেন বীর, যে কবিতার জন্য উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের আক্রমণের শিকার হন বীর, সেটিরই উল্লেখ করেন তিনি।
সংসদে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘আমি সেই ভারতের নাগরিক, যে ভারত বিপ্লবীদের জন্ম দিয়েছে, রক্তে সাহসের সঞ্চার করেছে। আবার সেই ভারতেই ‘জয় বাংলা’ বলা, ‘আমার সোনার বাংলা’ গাওয়া অনুপ্রবেশকারী বলে দাগিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। আমি সেই ভারতের নাগরিক, যেখানে ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’ বলে বুক চাপড়ানো হয়, আবার সেই ভারতেই পশ্চিমবঙ্গের প্রাপ্য বকেয়া , ১.৯৬ লক্ষ কোটি টাকা আটকে রাখা হয়। শুধু টাকা আটকে রাখা হয়নি, উৎকর্ষতা আটকে দেওয়া হয়েছে, প্রত্যেক ভারতীয় এবং প্রত্যেক রাজ্যের সমানাধিকারের যে বিধান রয়েছে সংবিধানে, তা আটকানো হয়েছে। এটা শাসনকার্য নয়, যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা নয়, এটা একটা বার্তা যে, লাইনে না এলে মূল্য চোকাতে হবে। আমাদের দুর্ভাগ্য যে, এই মুহূর্তে ভারতের দু’টি চেহারা, একটি ভারতকে অন্য ভারতের সামনে মাথানত করতে বলা হচ্ছে। এটাই সত্য।’
মঙ্গলবার লোকসভায় বক্তৃতা করতে গিয়ে প্রথমেই বাজেট ঘোষণা নিয়ে কটাক্ষ ছুঁড়ে দিয়ে অভিষেক অভিযোগ করেন, বাজেট ঘোষণা করতে গিয়ে নির্মলা সীতারামন ৮৫ মিনিট ধরে বক্তৃতা করলেও, একটি বারের জন্যও যে পশ্চিমবঙ্গের নাম মুখে আনেননি, পুরনো ঘোষণাকে নতুন বলে চালিয়ে দিয়েছেন। বকেয়া টাকা আটকে রেখে বাংলাকে বঞ্চিত করা হচ্ছে বলে অভিযোগ তোলেন। তিনি বলেন, ‘আমি এমন ভারতের নাগরিক, যেখানে অর্থমন্ত্রী গর্ব সহকারে ঘোষণা করেন যে, ভারত সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি। আবার এই ভারতেই সাত বছরে ৬.৫ লক্ষ কোটি টাকা করের জোগান দিয়ে, সেখান থেকে নিজের অধিকারের ভাগ পায় না বাংলা। বার বার অনুরোধ, আর্জি জানিয়েও, ১০০ দিনের কাজ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে আমাদের, আবাস যোজনা, গ্রাম সড়ক প্রকল্প, এমনকি ‘জল জীবন মিশনের’ আওতায় পানীয় জলের অধিকারও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এমন ভারতের নাগরিক আমি, যেখানে সুশাসনের প্রচার করা হয়। কিন্তু এই ভারতেই পরিত্যাগ করা হয়, দরিদ্র মানুষকে রোটি-কপড়া-মকানের জন্য লড়াই করতে হয়। আমি এমন ভারতের বাসিন্দা, যেখানে রাজধানীতে পেরেক পুঁতে, কংক্রিটের বেড়া তুলে কৃষকদের আন্দোলন আটকে দেওয়া হয়। আবার এই ভারতেই জঙ্গিরা রাজধানীতে ঢুকে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ১৫ জন নিরীহ মানুষকে হত্যা করতে পারে। আমি সেই ভারতের নাগরিক, যেখানে সর্বোচ্চ দফতর থেকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় যে, দেশের সীমান্ত নিরাপদ, লঙ্ঘন করা যাবে না। আবার সেই ভারতেই প্রতিশ্রুতি ধুলোয় গড়াগড়ি খায়। সন্ত্রাসবাদীরা সীমান্ত টপকে ঢুকে পড়ে, নিরাপত্তার বেড়াজাল এড়িয়ে পহেলগাঁওয়ে ঢুকে পড়ে এবং ২৬ জন নিরীহ নাগরিককে প্রকাশ্য দিনের আলোয় হত্যা করে।’

স্পিকারের বিরুদ্ধে অনাস্থায় নেই তৃণমূল
লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনার বিষয়ে তৃণমূল বড় ধাক্কা দিল কংগ্রেসকে। কংগ্রেস সাংসদরা বিড়লার বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাবে স্বাক্ষর করেছেন, অন্যদিকে তৃণমূল তা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। সমাজবাদী পার্টি এবং ডিএমকেও এই প্রস্তাবকে সমর্থন করেছে। তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এই বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন। তিনি বলেছেন যে, তাঁর মতে, বিরোধীদের প্রথমে স্পিকারের কাছে তাদের দাবিগুলি তুলে ধরে একটি যৌথ চিঠি লেখা উচিত ছিল এবং তিন দিন সময় দেওয়া উচিত ছিল। তিনি বলেন, যদি কোনও পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে তিন দিন পরে অনাস্থা প্রস্তাবের নোটিস দেওয়া উচিত ছিল, সেই সময়ে তৃণমূল কংগ্রেস যোগ দিত। অভিষেকের বক্তব্য, অনাস্থা প্রস্তাবই শেষ উপায়, আগেই ব্রহ্মাস্ত্রের আশ্রয় কেন? অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন,’আমাদের মতে, বিরোধীদের প্রথমে স্পিকারের কাছে তাদের দাবিগুলি তুলে ধরে একটি যৌথ চিঠি লেখা উচিত ছিল এবং তিন দিন সময় দেওয়া উচিত ছিল।’ তিনি বলেন, ‘যদি কোনও পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে তিন দিন পরে অনাস্থা প্রস্তাবের নোটিস জারি করা উচিত ছিল, সেই সময়ে তৃণমূল কংগ্রেস এতে যোগ দিত।’ অভিষেক আরও বলেন, ‘অনাস্থা প্রস্তাবই শেষ অবলম্বন, এখনই ব্রহ্মাস্ত্রের আশ্রয় কেন?’