‘আমাদের খাবার-ওষুধ কেন দেব?’ হাকিমপুর সীমান্তে অনুপ্রবেশ ইস্যুতে কড়া হুঁশিয়ারি শুভেন্দুর
সুষমা পাল মন্ডল। কলকাতা সারাদিন।
উত্তর ২৪ পরগনার বসিরহাটের হাকিমপুর সীমান্তে ফের বেড়েছে অনুপ্রবেশকারীদের ভিড়। সীমান্ত চেকপোস্টের সামনে ট্রলি, কম্বল, প্লাস্টিকের ছাউনি নিয়ে অপেক্ষমাণ বহু মানুষের ছবি ঘিরে ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে রাজনৈতিক তরজা। আর এই আবহেই মঙ্গলবার প্রশাসনিক বৈঠক থেকে অনুপ্রবেশ ইস্যুতে কড়া অবস্থান স্পষ্ট করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
কল্যাণীতে প্রশাসনিক বৈঠকে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি সরাসরি বার্তা দেন, “জলদি জলদি ভাগো। হাকিমপুরের ঘটনা টিভিতে দেখেছি। আমি শুধু বলব, তাড়াতাড়ি পালাও।” তাঁর এই মন্তব্য ঘিরে মুহূর্তে রাজনৈতিক মহলে চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে।
Bangladesh infiltrators in Bengal
শুধু সতর্কবার্তাই নয়, এদিন শুভেন্দু আরও এক ধাপ এগিয়ে প্রশ্ন তোলেন রাজ্যের সম্পদ বণ্টন নিয়েও। তাঁর কথায়, “আমাদের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থানের ভাগ ওদের কেন দেব?” রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, সীমান্ত নিরাপত্তা ও অনুপ্রবেশ ইস্যুকে সামনে রেখে জনমত আরও দৃঢ় করার কৌশলেই এই কড়া ভাষা ব্যবহার করেছে রাজ্য সরকার।
গত কয়েক দিন ধরেই বসিরহাটের হাকিমপুর সীমান্ত এলাকায় অস্বাভাবিক ভিড়ের ছবি সামনে আসছে। প্রশাসনিক সূত্রে খবর, বহু বাংলাদেশি নাগরিক সীমান্ত পেরিয়ে ফের দেশে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। মঙ্গলবার সকালেও হাকিমপুর চেকপোস্টের কাছে বহু মানুষকে অপেক্ষা করতে দেখা যায়। তাঁদের কারও হাতে ট্রলি, কারও সঙ্গে কম্বল-বালিশ, আবার কেউ প্লাস্টিক পেতে বসে রয়েছেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। (Detect Delete Deport policy
সোমবারও একই ছবি ধরা পড়েছিল সীমান্ত এলাকায়। স্থানীয় সূত্রে দাবি, প্রায় ১০০ জনেরও বেশি সন্দেহভাজন বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী ওই এলাকায় জড়ো হয়েছিলেন। আরও অনেকে বাইরে অপেক্ষা করছিলেন সীমান্ত পার হওয়ার আশায়।
রাজ্যে সরকার পরিবর্তনের পর থেকেই অনুপ্রবেশ ইস্যুতে প্রশাসনিক তৎপরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কয়েক দিন আগেই রাজ্যের তরফে জেলায় জেলায় নোটিস পাঠিয়ে ‘হোল্ডিং সেন্টার’ তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের বক্তব্য, বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী বা রোহিঙ্গা সন্দেহে যাঁদের আটক করা হবে, তাঁদের অস্থায়ীভাবে রাখার জন্যই এই কেন্দ্রগুলি তৈরি করা হচ্ছে।
এই সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর থেকেই সীমান্তবর্তী এলাকায় নতুন করে আলোড়ন তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক মহলের মতে, রাজ্যের নতুন সরকার স্পষ্ট বার্তা দিতে চাইছে যে অনুপ্রবেশ ইস্যুতে তারা ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে হাঁটবে।
মঙ্গলবারের বৈঠকে শুভেন্দু অধিকারী ফের জোর দিয়ে বলেন, ‘ডিটেক্ট-ডিলিট-ডিপোর্ট’ নীতিই এখন সরকারের প্রধান অবস্থান। অর্থাৎ, প্রথমে অনুপ্রবেশকারী চিহ্নিত করা, তারপর সরকারি নথি বা ভোটার তালিকা থেকে তাঁদের নাম বাদ দেওয়া এবং শেষে সীমান্ত পেরিয়ে ফেরত পাঠানো— এই তিন ধাপেই প্রশাসন এগোবে।
তিনি দাবি করেন, এই ধরনের আইন ও প্রশাসনিক কাঠামো নতুন নয়, আগেও ছিল। তবে এবার তা আরও কড়াভাবে কার্যকর করা হবে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, অনুপ্রবেশকারীদের ধরা পড়ার পর দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ায় না গিয়ে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সহায়তায় দ্রুত ফেরত পাঠানোর দিকেই জোর দিচ্ছে সরকার।
রাজনৈতিক মহলের মতে, সীমান্ত ও নাগরিকত্ব ইস্যু বরাবরই বঙ্গ রাজনীতিতে অত্যন্ত স্পর্শকাতর। বিশেষ করে উত্তর ২৪ পরগনা, নদিয়া, মালদহ কিংবা মুর্শিদাবাদের মতো সীমান্তবর্তী জেলাগুলিতে এই প্রশ্ন ভোট রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। ফলে অনুপ্রবেশ বিরোধী অবস্থানকে সামনে রেখে সরকার একদিকে যেমন প্রশাসনিক কড়াকড়ির বার্তা দিতে চাইছে, অন্যদিকে তৃণমূল স্তরে রাজনৈতিক সমর্থন আরও মজবুত করার চেষ্টাও স্পষ্ট।

তবে বিরোধী শিবিরের একাংশ ইতিমধ্যেই প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে মানবাধিকার এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নিয়ে। তাঁদের দাবি, শুধুমাত্র সন্দেহের ভিত্তিতে কাউকে অনুপ্রবেশকারী তকমা দেওয়া উচিত নয় এবং আইনি কাঠামো মেনেই ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, হাকিমপুর সীমান্তের ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজ্যের রাজনীতি যে আগামী দিনে আরও উত্তপ্ত হতে চলেছে, তা কার্যত স্পষ্ট। আর সেই উত্তাপের কেন্দ্রবিন্দুতে এখন ‘ডিটেক্ট-ডিলিট-ডিপোর্ট’ নীতি এবং শুভেন্দু অধিকারীর কড়া বার্তা।