কলকাতায় (Kolkata) ম্যারাথন তল্লাশির পর কড়া পদক্ষেপ, আর্থিক লেনদেন ঘিরে নতুন করে তোলপাড় রাজ্য রাজনীতি
শোভন গায়েন। কলকাতা সারাদিন।
রাজ্য রাজনীতিতে ফের বড়সড় ঝড়। এবার সরাসরি শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের (TMC) আর্থিক লেনদেনকে ঘিরে বিস্ফোরক পদক্ষেপ নিল কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা ইডি (Enforcement Directorate)। কলকাতায় (Kolkata) একাধিক জায়গায় দীর্ঘ তল্লাশি অভিযানের পর এইচডিএফসি (HDFC Bank)-তে থাকা তৃণমূলের তিনটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে থাকা মোট ৪৪০.৪২ কোটি টাকার লেনদেন স্থগিত করা হয়েছে বলে তদন্তকারী সংস্থার দাবি। এই ঘটনাকে ঘিরে রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে তীব্র জল্পনা।
তদন্তকারী সংস্থার দাবি, আর্থিক তছরুপ প্রতিরোধ আইন (PMLA)-এর আওতায় এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তাদের অভিযোগ, কয়েক বছরের মধ্যে দলীয় তহবিল থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ এমন কিছু সংস্থায় পাঠানো হয়েছে, যাদের মাধ্যমে বিলাসবহুল বিমান ও হেলিকপ্টার কেনা হয়েছে বলে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। যদিও এই অভিযোগের বিষয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত প্রকাশ্যে আসেনি।
ইডি সূত্রের দাবি, তৃণমূল কংগ্রেসের মোট ১২টি ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মধ্যে সাতটি নিয়মিত ব্যবহার করা হত। তার মধ্যে কয়েকটি অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে একটি বেসরকারি বিমান পরিবহণ সংস্থার সঙ্গে বিপুল আর্থিক লেনদেনের তথ্য তদন্তকারীদের নজরে আসে। সেই কারণেই মূলত তিনটি অ্যাকাউন্টের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।
পুরো তদন্তের সূত্রপাত হয় বিধাননগর (Bidhannagar)-এর সাইবার ক্রাইম থানায় দায়ের হওয়া একটি এফআইআর-এর ভিত্তিতে। অভিযোগ ছিল, বেআইনিভাবে অর্থ সংগ্রহ, সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেন এবং বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে বিপুল অঙ্কের অর্থ স্থানান্তরের ঘটনা ঘটেছে। সেই অভিযোগের সূত্র ধরেই ইডি তদন্তে নামে।
তদন্তে উঠে এসেছে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। কেন্দ্রীয় সংস্থার দাবি, ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে প্রায় ১৬০ কোটি টাকা Carewell Aviation India Pvt Ltd এবং তাদের সহযোগী সংস্থাগুলির অ্যাকাউন্টে পাঠানো হয়েছিল। এরপর আরও প্রায় ৮২.৯৬ কোটি টাকা অন্য একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তর করা হয় বলে অভিযোগ।
ইডির দাবি অনুযায়ী, এই বিপুল অর্থের একটি অংশ ব্যবহার করে একটি বিলাসবহুল Embraer Legacy 600 বিমান এবং একটি Agusta 109 Grand New হেলিকপ্টার কেনা হয়েছে। তদন্তকারীদের হিসাব অনুযায়ী, এই দুই উড়ানযান কিনতেই প্রায় ১১২ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি আলোড়ন ফেলেছে তদন্তকারীদের আর একটি দাবি। ইডির বক্তব্য, দলীয় তহবিল থেকে অর্থ পাঠিয়ে প্রথমে বিমান ও হেলিকপ্টার কেনা হয়। এরপর সেই একই উড়ানযান আবার নির্বাচনী প্রচার বা অন্যান্য কাজে তৃণমূল কংগ্রেসের কাছেই ভাড়ায় দেওয়া হত। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আরও বিপুল অঙ্কের আর্থিক লেনদেন হয়েছে বলে সন্দেহ প্রকাশ করেছে তদন্তকারী সংস্থা। তবে এই অভিযোগ এখনও তদন্তাধীন এবং আদালতে প্রমাণিত হয়নি।
এতেই শেষ নয়। তদন্তে বিদেশি আর্থিক লেনদেনের দিকেও নজর পড়েছে। ইডির অভিযোগ, ২০২৩ সালে কেম্যান আইল্যান্ডস (Cayman Islands)-ভিত্তিক একটি সংস্থা থেকে প্রায় ১৭ লক্ষ মার্কিন ডলারের অসুরক্ষিত ঋণ নেওয়া হয়েছিল। ভারতীয় মুদ্রায় যার মূল্য প্রায় ১৪ কোটি টাকার কাছাকাছি। এই বিদেশি অর্থের উৎস, ব্যবহার এবং তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা সংস্থার ভূমিকাও এখন খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ইডি জানিয়েছে, এই জটিল আর্থিক লেনদেনের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী ছিল, কারা এর সুবিধাভোগী এবং কোনও বেআইনি অর্থপাচারের যোগ রয়েছে কি না—সেই সমস্ত বিষয় খতিয়ে দেখতেই তদন্ত এগোচ্ছে। তদন্তকারীদের মতে, শুধু অর্থের পরিমাণ নয়, অর্থের প্রবাহ এবং ব্যবহার—দুই দিকই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রাজনৈতিক মহলেও এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে তীব্র চাপানউতোর। বিরোধীরা ইতিমধ্যেই এই ঘটনাকে হাতিয়ার করে শাসক দলকে নিশানা করতে শুরু করেছে। অন্যদিকে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, তদন্তের অগ্রগতি এবং আদালতের পরবর্তী নির্দেশের ওপরই নির্ভর করবে এই মামলার ভবিষ্যৎ।

আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, কোনও অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করা মানেই অভিযোগ প্রমাণিত হয়ে যাওয়া নয়। এটি তদন্তের একটি প্রক্রিয়াগত পদক্ষেপ। শেষ পর্যন্ত আদালতের পর্যবেক্ষণ এবং তদন্তে উঠে আসা প্রমাণই নির্ধারণ করবে অভিযোগের সত্যতা।
এই ঘটনার জেরে আগামী দিনে রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন বিতর্ক তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশ্লেষকেরা। তদন্ত যত এগোবে, ততই সামনে আসতে পারে নতুন তথ্য। আর সেই কারণেই এখন নজর একটাই—ইডির পরবর্তী পদক্ষেপ কী হয় এবং এই মামলায় নতুন করে আর কার নাম উঠে আসে। এবার কী নতুন মোড় নেবে এই বহুচর্চিত তদন্ত?