তৃণমূলে সাংগঠনিক রদবদল, রাজ্য সভানেত্রীর দায়িত্ব নিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, সাধারণ সম্পাদক মদন মিত্র ও কুণাল ঘোষ
শৌনক মন্ডল। কলকাতা সারাদিন।
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে মুখ থুবড়ে পড়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গড়েছে বিজেপি। কিন্তু এরপরেও হার স্বীকার করেননি মমতা। আর এজন্য পদত্যাগ করতে রাজভবনেও যাননি। কিন্তু শনিবার সেই মমতাই যেন একপ্রকার হার স্বীকার করে নিলেন। পাশাপাশি নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকেও শুভেচ্ছা জানিয়েছেন তিনি।
অবশ্য তাঁকে খোঁচা দিতেও ছাড়েননি মমতা।
শনিবার বিকেলে ফেসবুক লাইভে আসেন তৃণমূল সুপ্রিমো। সেখানেই একাধিক বিষয়ে সরব হন তিনি। বিজেপি ও নির্বাচন কমিশনকে তোপ দাগার পাশাপাশি কর্মীদের পাশে থাকারও বার্তা দেন মমতা।কর্মীরাই যে দলের প্রকৃত সম্পদ, সেটাও তিনি মনে করিয়ে দেন।
শনিবার একটি ভিডিও বার্তায় বিজেপি এবং রাজ্যের নতুন সরকারকে তীব্র আক্রমণ করেন তৃণমূল নেত্রী। তাঁর অভিযোগ, বিজেপির সংগঠন দুর্বল বলেই প্রশাসনকে রাজনৈতিক কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। মমতার কথায়, ‘ওদের (বিজেপির) নিজেদের সংগঠন নেই। তাই থানার আইসিদের দিয়ে ব্লক সভাপতির কাজ করানো হচ্ছে, এসপিদের দিয়ে জেলা সভাপতির দায়িত্ব পালন করানো হচ্ছে। মানুষের পাশে দাঁড়ানোর বদলে ভয় দেখিয়ে রাজনীতি করা হচ্ছে।’ তাঁর আরও অভিযোগ, রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের উপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। বিজেপিতে যোগ না দিলে গ্রেফতারের ভয় দেখানো হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।
এদিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “যিনি আজ মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন, আমার অনেক শুভেচ্ছা থাকবে। কিন্তু এটা আমি নিশ্চয়ই বলব না যে, আপনি মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন বলে তৃণমূলটা করেননি! আপনিও কংগ্রেস করতেন একদিন। আপনিও নির্বাচনে অনেক বার হেরেছেন। আপনার জন্য আমি বার বার যেতাম আপনার কেন্দ্রে। সেটা আমার কর্তব্য ছিল। এর জন্য আমি কোনও কৃতিত্ব নিচ্ছি না। আপনিও ১০-১১ বছর তৃণমূলের বিধায়ক হিসেবে মন্ত্রী ছিলেন। কখনও পরিবহণ মন্ত্রী, কখনও সেচমন্ত্রী, কখনও ৬টি জেলার দায়িত্বে ছিলেন, জেলা পরিষদ, গ্রামসভা, পঞ্চায়েত তৈরিতে সাহায্য করেছেন। সাহায্যের হাতও বাড়িয়েছেন, নাড়িয়েওছেন। আমি কিন্তু সবটাই জানি। হলদিয়া থেকে দিঘা ডেভলপমেন্ট বোর্ড, আমাদের সরকার আপনাদের দিয়ে চালিয়েছে।”
এরপরেই খোঁচা দিয়ে মমতা বলেন, “হঠাৎ আজ মাত্র তিন-চার বছরের মধ্যে যারা সাধু, তারা আপনাদের সঙ্গে গিয়ে সাধু হয়ে গেল। আর যারা কোনও দিন কিছু পায়নি, লড়াই করেছে, তাদের পিছনে লেগে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস করাচ্ছেন! মনে রাখবেন, সব ক্রিয়ার একটা প্রতিক্রিয়া আছে।
ভিডিও বার্তায় নিজের রাজনৈতিক অবস্থানও স্পষ্ট করেন তৃণমূল নেত্রী। তিনি বলেন, ‘সংগ্রামই আমার জীবন। সংগ্রামের মধ্যেই আমার জন্ম। যতদিন বেঁচে থাকব, লড়াই করেই থাকব।’ একইসঙ্গে তাঁকে নিয়ে কটূক্তির অভিযোগও তোলেন মমতা। বলেন, ‘শুনছি কেউ কেউ আমার মৃত্যুকামনাও করছেন। ফোন করে বলছেন, আর ক’দিন বাঁচবেন! কিন্তু আমি এখনও আছি, আরও অনেকদিন থাকব। আমার পরের প্রজন্মও থাকবে।’ তাঁর কথায়, ‘কেউ কেউ হয়তো মাথা নত করতে পারে। কিন্তু কেউ কেউ আবার দলের পতাকাকে আঁকড়ে ধরে লড়াই করে। আমরা ভেঙে পড়ি না, আমরা নতুন করে গড়ে তুলি। এটাই আমাদের শক্তি।’
পাশাপাশি মমতার স্পষ্ট বার্তা, একুশে জুলাই হবে শহীদ স্মরণ। তিনি বলেন, “আমরা অনুমতি চেয়েছি কিন্তু পুলিশ কোনও কিছুতেই আমাদের অনুমতি দিচ্ছে না। একবার ভাবুন তো, একটা পুলিশ কখনও বলতে পারে আগস্ট পর্যন্ত কলকাতায় কোনও সমাবেশ হবে না!”
তৃণমূল সুপ্রিমো বলেন, “আরে এ আবার কী কথা! সম্পূর্ণ গণতন্ত্রের কণ্ঠ রোধ? গায়ের জোরে নির্দেশ! এখানে কোনও ১৪৪ ধারাও নেই। তো কেন করছেন এসব? শুধু তৃণমূল কংগ্রেসের অনুষ্ঠানটা ভেস্তে দেওয়ার জন্য?”
মমতা বলেন, “রিকশায় দাঁড়িয়ে হলেও আমাদের অনুষ্ঠান হবে। একটা জিনিস জেনে রাখুন, হৃদয় যখন নাড়া দেয়, কোনও বাধাই কোনও বাধা মানে না। দেখবেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষাতেই একুশে জুলাই হবে। বাঁধ ভেঙে দাও…. বাঁধ ভেঙে দাও…। সন্ত্রাসের বাঁধ ভাঙো, শহীদ স্মরণে এসো।”
তিনি আরও বলেন, “পুলিশের কাছে অনুমতি চেয়েছি। অনুমতি পেলে কোন জায়গায় আসবেন সেটা আপনাদের জানিয়ে দেব।”

রাজ্য সভানেত্রী মমতা নিজেই
তৃণমূল কংগ্রেসের (TMC) রাজ্য সংগঠনে ফের বড় পরিবর্তন। চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের (Chandrima Bhattacharya) পদত্যাগের পর দলের রাজ্য সভানেত্রীর দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)। শনিবার ফেসবুক লাইভে এই ঘোষণা করেন তিনি। একই সঙ্গে কামারহাটির বিধায়ক মদন মিত্র (Madan Mitra) এবং দলের নেতা কুণাল ঘোষকে (Kunal Ghosh) রাজ্য তৃণমূলের দুই সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
ফেসবুক লাইভে মমতা জানান, তিনি সর্বভারতীয় চেয়ারপার্সনের পাশাপাশি আপাতত রাজ্য সভানেত্রীর দায়িত্বও পালন করবেন। এর মাধ্যমে দলের সাংগঠনিক কার্যক্রমে সরাসরি নজরদারি করবেন বলেই রাজনৈতিক মহলের একাংশের ধারণা।