জোড়া গোলে ব্রাজিলকে কাঁদালেন আর্লিং হালান্ড, নেইমারের শেষ মুহূর্তের গোলেও রক্ষা হল না সাম্বা ব্রিগেডের। নিউইয়র্কে ইতিহাস গড়ল নরওয়ে।
শৌনক মন্ডল। কলকাতা সারাদিন।
বিশ্বকাপ আবারও দেখল ব্রাজিলের কান্না, আর দেখল আর্লিং হালান্ডের নির্মম ফুটবল। নিউইয়র্কের মেটলাইফ স্টেডিয়ামে শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই হলুদ জার্সিতে ঢেকে থাকা গ্যালারি নিস্তব্ধ। অন্যদিকে নরওয়ের ফুটবলারদের উল্লাসে ফেটে পড়ল মাঠ। স্কোরলাইন বলছে ২-১, কিন্তু ম্যাচের চিত্র বলছে—এদিন ব্রাজিলকে প্রায় একাই হারিয়ে দিলেন হালান্ড।
পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের স্বপ্ন ছিল বহু প্রতীক্ষিত ষষ্ঠ বিশ্বকাপ জয়ের। কিন্তু সেই হেক্সা আবারও অধরাই রয়ে গেল। প্রি-কোয়ার্টার ফাইনালেই বিদায় নিতে হল কার্লো আনচেলত্তির দলকে। অন্যদিকে [আর্লিং হালান্ড (Erling Haaland)] যেন প্রমাণ করে দিলেন, বড় মঞ্চে বড় তারকারাই ইতিহাস লেখেন।
শুরু থেকেই ম্যাচে চাপ তৈরি করেছিল নরওয়ে। মাত্র চার মিনিটের মধ্যেই বল জালে জড়িয়েছিলেন [মার্টিন ওডেগার্ড (Martin Odegaard)]। যদিও অফসাইডের কারণে সেই গোল বাতিল হয়। তাতেই যেন সতর্ক হওয়ার সুযোগ পেয়েছিল ব্রাজিল। কিন্তু সেই সতর্কতা মাঠে দেখা গেল না।
১৪ মিনিটে সুবর্ণ সুযোগ এসেছিল সাম্বা ব্রিগেডের সামনে। বক্সের মধ্যে ফাউলের জন্য পেনাল্টি পায় ব্রাজিল। কিন্তু [ব্রুনো গিমারায়েস (Bruno Guimaraes)]-এর শট অসাধারণ দক্ষতায় আটকে দেন নরওয়ের গোলরক্ষক [ওরইয়ান নিল্যান্ড (Orjan Nyland)]। ১৯৮৬ সালের পর বিশ্বকাপে ব্রাজিলের প্রথম পেনাল্টি মিস—আর সেই মুহূর্তটাই যেন ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

প্রথমার্ধে [ভিনিসিয়ুস জুনিয়র (Vinicius Jr.)]-সহ একাধিক ব্রাজিলিয়ান ফুটবলারের শট রুখে দেন নিল্যান্ড। গোলরক্ষকের দৃঢ়তায় আত্মবিশ্বাস বাড়তে থাকে নরওয়ের। অন্যদিকে ব্রাজিলের আক্রমণে ছিল না ছন্দ, মাঝমাঠে ছিল না নিয়ন্ত্রণ, আর রক্ষণে ছিল একের পর এক ফাঁক।

দ্বিতীয়ার্ধে আক্রমণের গতি বাড়ানোর চেষ্টা করেন আনচেলত্তি। মাঠে নামানো হয় তরুণ [এন্ড্রিক (Endrick)]-কে। পরে শেষ অস্ত্র হিসেবে নামেন [নেইমার (Neymar)]। কিন্তু সুযোগ তৈরি হলেও গোল আসছিল না। বরং পাল্টা আক্রমণে বারবার ব্রাজিলের রক্ষণকে চাপে ফেলছিল নরওয়ে।

এরপরই শুরু হয় হালান্ডের আসল শো।
৭৯ মিনিটে দুর্দান্ত হেডে গোল করে নরওয়েকে এগিয়ে দেন [আর্লিং হালান্ড (Erling Haaland)]। ব্রাজিল তখন সমতা ফেরাতে মরিয়া। কিন্তু সেই তাড়াহুড়োই কাল হয়ে দাঁড়ায়। ৯০ মিনিটে বক্সের বাইরে থেকে বাঁ পায়ের নিখুঁত শটে দ্বিতীয় গোল করেন হালান্ড। মুহূর্তের মধ্যে স্তব্ধ হয়ে যায় ব্রাজিল শিবির।
যোগ করা সময়ে পেনাল্টি থেকে একটি গোল শোধ করেন নেইমার। কিন্তু সেটি ছিল শুধুই ব্যবধান কমানোর গোল। ম্যাচের ফল বদলানোর জন্য যথেষ্ট ছিল না।
এই হারে আরও একবার সামনে চলে এল ব্রাজিলের পুরনো সমস্যা। শেষ কয়েকটি বিশ্বকাপেই ইউরোপীয় দলের বিরুদ্ধে নকআউটে ব্যর্থ হয়েছে তারা। এবারও সেই অভিশাপ কাটল না। তার ওপর নরওয়ের বিরুদ্ধে ইতিহাসে প্রথম জয় পাওয়ার স্বপ্নও অপূর্ণ থেকে গেল।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠছে ব্রাজিলের ফুটবল দর্শন নিয়েই। এক সময় যে দলকে শিল্প, গতি আর সৃজনশীলতার প্রতীক বলা হত, সেই দল এদিন ছিল সম্পূর্ণ ছন্দহীন। মাঝমাঠে ছিল না নেতৃত্ব, আক্রমণে ছিল না ধার, আর রক্ষণে দেখা গেল ভয়াবহ সমন্বয়ের অভাব।
অন্যদিকে নরওয়ে লিখল নতুন ইতিহাস। দেশের ফুটবল ইতিহাসে প্রথমবার বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছে গেল তারা। দলের সাফল্যের কেন্দ্রে ছিলেন হালান্ড, তবে সমান প্রশংসা প্রাপ্য গোলরক্ষক নিল্যান্ড এবং অধিনায়ক ওডেগার্ডেরও।
ম্যাচ শেষে নরওয়ের ফুটবলারদের সঙ্গে বিখ্যাত ‘ভাইকিং ক্ল্যাপ’-এ অংশ নেন হালান্ড। মুখে বড় কোনও উচ্ছ্বাস ছিল না। যেন তিনি জানতেন, এটাই তাঁর কাজ। বড় ম্যাচে গোল করা, দলকে জেতানো এবং ইতিহাস লেখা।

এদিকে নিউইয়র্কের [মেটলাইফ স্টেডিয়াম (MetLife Stadium)]-এ চোখের জল লুকোতে পারেননি ব্রাজিল সমর্থকেরা। ২০০২ সালের পর আবার বিশ্বকাপ জয়ের যে স্বপ্ন তাঁরা এতদিন ধরে বুকে লালন করে এসেছিলেন, তা আরও একবার ভেঙে গেল।
এখন প্রশ্ন একটাই—এই ব্যর্থতার পর কী বড় পরিবর্তনের পথে হাঁটবে ব্রাজিল? নাকি আরও একবার নতুন স্বপ্ন দেখিয়ে আবারও অপেক্ষায় রাখবে কোটি কোটি সমর্থককে?