ভারতীয়দের জন্য ১৫ অগস্ট একটি আবেগ, গৌরব এবং ত্যাগের প্রতীক। প্রায় ২০০ বছরের ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্তি পাওয়ার পর ভারত এবার উদযাপন করবে ৭৯তম স্বাধীনতা দিবস। শহর থেকে গ্রাম—প্রতিটি প্রান্তে জাতীয় পতাকার রঙে রঙিন হয়ে ওঠে দেশ। তবে আপনি কি জানেন, কেন ভারতের স্বাধীনতা দিবসের জন্য ১৫ অগস্ট-ই বেছে নেওয়া হয়েছিল? আসুন, ফিরে যাওয়া যাক সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তে।
পূর্ণ স্বরাজের ডাক ও ২৬ জানুয়ারির গুরুত্ব
১৯২৯ সালে কংগ্রেসের লাহোর অধিবেশনে সভাপতি জওহরলাল নেহেরু ‘পূর্ণ স্বরাজ’-এর ডাক দেন। তখন ২৬ জানুয়ারি দিনটিকে স্বাধীনতা দিবস হিসেবে পালন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ১৯৩০ থেকে ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত কংগ্রেস ২৬ জানুয়ারিকে স্বাধীনতা দিবস হিসেবে উদযাপন করত। পরবর্তীতে ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি স্বাধীন ভারতের প্রথম সংবিধান কার্যকর হয়, যা আজ গণতন্ত্র দিবস হিসেবে পালিত হয়।
লর্ড মাউন্টব্যাটেনের পরিকল্পনা
ব্রিটিশ পার্লামেন্ট লর্ড মাউন্টব্যাটেনকে ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য ১৯৪৮ সালের জুন মাস পর্যন্ত সময় দিয়েছিল। কিন্তু ভারতজুড়ে তখন তীব্র বিক্ষোভ ও আন্দোলন চলছিল। মাউন্টব্যাটেন বুঝতে পারেন, দেরি হলে পরিস্থিতি আরও অস্থির হবে। তাই তিনি স্বাধীনতার তারিখ এগিয়ে আনেন ১৯৪৭ সালের অগস্টে।
কংগ্রেস নেতা চক্রবর্তী রাজা গোপালাচারী স্পষ্ট করে বলেছিলেন—যদি ১৯৪৮ পর্যন্ত অপেক্ষা করা হত, ব্রিটিশদের হাতে কোনও ক্ষমতাই অবশিষ্ট থাকত না। তাই দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
কেন ১৫ অগস্ট?
ইতিহাসবিদদের মতে, ১৫ অগস্ট বেছে নেওয়ার পিছনে ব্যক্তিগত কারণ ছিল লর্ড মাউন্টব্যাটেনের। ১৯৪৫ সালের ১৫ অগস্ট দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপান আত্মসমর্পণ করেছিল। মাউন্টব্যাটেন তখন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মিত্রবাহিনীর সেনাপতি ছিলেন। তিনি দিনটিকে শুভ বলে মনে করতেন এবং তাই ভারতের স্বাধীনতার দিন হিসেবে বেছে নেন।
‘ফ্রিডম অ্যাট মিডনাইট’ গ্রন্থে ল্যারি কলিন্স ও ডমিনিক লা পিয়েরে লিখেছেন, মাউন্টব্যাটেন নিজেই এই তারিখ নির্ধারণ করেন। তাঁর মতে, এই দিনে ক্ষমতা হস্তান্তর করলে ভারতের জন্য শুভ হবে।
পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস কেন ১৪ অগস্ট?
ভারত ও পাকিস্তান—দুটো দেশকেই স্বাধীনতা দেওয়ার জন্য ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ১৫ অগস্ট নির্ধারণ করেছিল। পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলি জিন্নাও প্রথম ভাষণে বলেন, “১৫ অগস্ট স্বাধীন পাকিস্তানের জন্মদিন।” কিন্তু ১৯৪৮ সাল থেকে পাকিস্তান ১৪ অগস্টকে স্বাধীনতা দিবস হিসেবে পালন শুরু করে।
এর কারণ, ১৯৪৭ সালের ১৪ অগস্ট রাতটি ছিল রমজান মাসের ২৭ তারিখ—যা মুসলমানদের কাছে পবিত্র রাত হিসেবে বিবেচিত।
লালকেল্লায় পতাকা উত্তোলন
১৯৪৭ সালের ১৫ অগস্ট মধ্যরাতে স্বাধীনতা ঘোষণা হওয়ার পর জওহরলাল নেহেরু ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। পরদিন সকালে তিনি দিল্লির লালকেল্লার লাহোরি গেটের উপরে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। তখন থেকেই প্রতি বছর প্রধানমন্ত্রী লালকেল্লায় পতাকা উত্তোলন করে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন।
মহাত্মা গান্ধীর অনুপস্থিতি
আশ্চর্যের বিষয়, ভারতের স্বাধীনতা দিবসে মহাত্মা গান্ধী উপস্থিত ছিলেন না। তিনি তখন বাংলার নোয়াখালিতে হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা থামাতে উপবাস করছিলেন। তাঁর কাছে মানবিক সম্প্রীতি ছিল রাজনৈতিক উদযাপনের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ভারতের স্বাধীনতা ত্বরান্বিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। যুদ্ধের শেষে ব্রিটেন আর্থিক ও সামরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। জাপানের আত্মসমর্পণের দিনটি (১৫ অগস্ট) মাউন্টব্যাটেনের মনে গেঁথে ছিল, যা পরবর্তীতে ভারতের স্বাধীনতার সঙ্গে যুক্ত হয়।
ভারত বিভাজন ও স্বাধীনতার ঘোষণা
১৯৪৭ সালের ৪ জুলাই ব্রিটিশ হাউস অফ কমন্সে ভারতীয় স্বাধীনতা বিল পেশ করা হয়, যেখানে ভারত-পাকিস্তান বিভাজনের প্রস্তাব ছিল। ১৮ জুলাই বিলটি পাশ হয়। এরপর ১৪-১৫ অগস্ট মধ্যরাতে স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়।
দুঃখজনক হলেও সত্যি, স্বাধীনতার সঙ্গে সঙ্গেই দেশজুড়ে শুরু হয় ভয়াবহ দাঙ্গা ও সহিংসতা, যা লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়।
আজকের প্রেক্ষাপটে স্বাধীনতা দিবস
২০২৫ সালে ভারতের স্বাধীনতার ৭৯তম বর্ষ উদযাপন হবে। আধুনিক ভারত আজ প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও মহাকাশ অভিযানে অগ্রসর হলেও, স্বাধীনতার এই ইতিহাস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—স্বাধীনতা কোনও উপহার নয়, এটি লাখো মানুষের ত্যাগের ফল।
Independence Day 2025 history শুধুমাত্র একটি তারিখ নয়—এটি সাহস, ত্যাগ, ঐক্য ও লড়াইয়ের প্রতীক। কেন ১৫ অগস্টকে বেছে নেওয়া হয়েছিল, তা জানলে বোঝা যায় স্বাধীনতার পথ কতটা কণ্টকাকীর্ণ ছিল। এই দিন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, স্বাধীনতা রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের প্রত্যেকের।