স্বরূপ বিশ্বাস গ্রেফতারের পর ক্ষোভে ফুঁসছে এলাকা, ক্লাবে ঢুকে স্থানীয়দের চোখ কপালে
বিতস্তা সেন। কলকাতা সারাদিন।
কলকাতা: একসময় এলাকার ক্ষমতার কেন্দ্র বলে পরিচিত ছিল সুরুচি সংঘ। কিন্তু রাজনৈতিক পালাবদল আর স্বরূপ বিশ্বাসের গ্রেফতারের পর সেই ক্লাবই এখন তীব্র বিতর্কের কেন্দ্রে। বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে সুরুচি সংঘের সামনে জমতে থাকে স্থানীয় মানুষের ভিড়। এরপরই শুরু হয় বিক্ষোভ, ভাঙচুর এবং ক্লাবের অন্দরমহল ঘিরে একের পর এক বিস্ফোরক দাবি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বাইরে থেকে সাধারণ ক্লাব মনে হলেও ভিতরে ছিল একেবারে অন্য ছবি। তালা ভেঙে ক্লাবের ভিতরে প্রবেশ করার পর উপরের তলায় গিয়ে অনেকেই হতবাক হয়ে যান। সেখানে নাকি একটি পূর্ণাঙ্গ বেডরুমের মতো ব্যবস্থা ছিল। ঘরে রাখা ছিল কিং সাইজ খাট, দামি চেয়ার, উন্নতমানের সিলিং ফ্যান এবং সংযুক্ত বাথরুম।
স্থানীয়দের একাংশের দাবি, কয়েকদিন আগেও ঘরে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (AC) লাগানো ছিল। সম্প্রতি তা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে তাঁদের অভিযোগ। বাথরুমের পরিকাঠামোও ছিল অত্যন্ত উন্নতমানের, যা সাধারণ ক্লাবঘরের সঙ্গে মেলে না বলেই দাবি স্থানীয়দের।
Swaroop Biswas Arrested : অরূপ বিশ্বাসের ভাই স্বরূপ বিশ্বাস গ্রেফতার
তবে বিতর্ক এখানেই থামেনি।
বিক্ষোভকারীদের দাবি, ক্লাব চত্বরে একটি গোয়ালঘরও রয়েছে এবং সেখানে একটি গরুও রাখা হয়েছিল। ক্লাব ভবনের মধ্যে বেডরুম ও গোয়ালঘরের উপস্থিতি ঘিরে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। স্থানীয়দের অনেকেই জানতে চাইছেন, একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্লাবের ভিতরে এমন পরিকাঠামোর প্রয়োজন কেন?
ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া বিভিন্ন সামগ্রী নিয়েও শুরু হয়েছে জোর বিতর্ক। স্থানীয়দের দাবি, ক্লাবের একাধিক ঘর থেকে সরকারি প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত বলে মনে হওয়া নথি, বিপুল সংখ্যক নতুন শাড়ি এবং সরকারি ব্র্যান্ডের পানীয় জলের বোতল পাওয়া গিয়েছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, এই সমস্ত সামগ্রীর উৎস এবং ব্যবহারের বিষয়ে স্বচ্ছতা থাকা প্রয়োজন। যদিও এই অভিযোগগুলির সরকারি বা প্রশাসনিকভাবে এখনও কোনও স্বাধীন যাচাই হয়নি।
এছাড়াও ক্লাবের ভিতর থেকে ভোটার তালিকা, বিভিন্ন ফাইল, জীবনবৃত্তান্ত (CV) এবং সংগঠন সংক্রান্ত কিছু নথি উদ্ধার হয়েছে বলেও দাবি স্থানীয়দের। দামি টেলিভিশন এবং অন্যান্য ইলেকট্রনিক সামগ্রীও দেখা গিয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।
স্বরূপ বিশ্বাসকে গ্রেফতারের পর থেকেই এলাকায় উত্তেজনা ক্রমশ বেড়েছে। ঘটনাস্থলে উপস্থিত কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দার বক্তব্য, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অভিযোগ নিয়ে ক্ষোভ জমে ছিল। সেই ক্ষোভই এদিন বিস্ফোরিত হয়েছে।
ঘটনার জেরে এক ব্যক্তিকে ঘিরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, তাঁকে ধাওয়া করা হলে তিনি নিউ আলিপুর থানায় আশ্রয় নিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেন।
রাজনৈতিক মহলেও এই ঘটনাকে ঘিরে জোর চর্চা শুরু হয়েছে। কারণ, সুরুচি সংঘ শুধু একটি ক্লাব নয়, দীর্ঘদিন ধরে কলকাতার সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পরিসরে পরিচিত একটি নাম। ফলে ক্লাবের ভিতর থেকে কী কী উদ্ধার হয়েছে, সেই প্রশ্ন এখন রাজনৈতিক মহল থেকে সাধারণ মানুষের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
এদিকে বিরোধীরা ইতিমধ্যেই এই ঘটনাকে সামনে এনে শাসক দলের বিরুদ্ধে তোপ দাগতে শুরু করেছে। অন্যদিকে তদন্ত সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছনো উচিত নয় বলেও মত একাংশের।

তবে একটা বিষয় স্পষ্ট— সুরুচি সংঘের অন্দরমহল নিয়ে যে প্রশ্নগুলির জন্ম হয়েছে, তার উত্তর খুঁজছে এখন গোটা বাংলা। উদ্ধার হওয়া সামগ্রী, স্থানীয়দের অভিযোগ এবং চলতে থাকা তদন্ত— সব মিলিয়ে এই বিতর্ক কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহল থেকে সাধারণ মানুষের।
সুরুচি সংঘের বন্ধ দরজার আড়ালে ঠিক কী চলত? তদন্ত যত এগোবে, ততই কি সামনে আসবে নতুন তথ্য? এখন সেই অপেক্ষাতেই রাজ্যবাসী।