২১ জুলাই কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশ করে মমতা সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুললেন শুভেন্দু অধিকারী
সুষমা পাল মন্ডল। কলকাতা সারাদিন।
৩৩ বছর কাটলো। কেউ কথা রাখেনি। ১৯৯৩ সালের ২১ শে জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ২১ শে জুলাই – কথা রাখেননি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিচারপতি সুশান্ত চট্টোপাধ্যায়ের একুশে জুলাই কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশ্যে এনে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ফাঁস করে দিলেন ১৯৯৩ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এনে নেতৃত্বে মহাকরণ অভিযানে শহীদ হওয়া যুব কংগ্রেস কর্মীদের পরিবারের সঙ্গে প্রতারনা করেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
সোমবার সকালেই ২১ জুলাই নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৈরি চ্যাটার্জি কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশ্যে আনবেন বলে বিধানসভায় ঘোষণা করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সেইমতো বিকেলে ফাইলটি হাতে নিয়ে তিনি বিধানসভায় আসেন। বলেন, ‘১৯৯৩ সালের ২১ জুলাই কী হয়েছিল, পশ্চিমবঙ্গের মানুষ এখনও ঠিকমতো জানে না। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তদন্ত কমিশন তৈরি করলেও তার রিপোর্ট কখনও প্রকাশ্যে আনেননি।আমি এই রিপোর্ট পড়ে শোনাচ্ছি। কারণ, বিধানসভা চলাকালীন আমি অন্য কোথাও এই রিপোর্ট প্রকাশ করতে পারতাম না। সেদিনের ঘটনায় পুলিশ কমিশনারের রিপোর্ট, আধিকারিকদের রিপোর্টের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। যে তদন্ত কমিশন তৈরি হয়েছিল, সেখানে আজ যিনি নিজেকে সবচেয়ে বড় আন্দোলনকারী বলেন, তৎকালীন কংগ্রেস যুবনেত্রী, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেই কখনও তদন্তের জন্য জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি। হয়ত বারণ করা ছিল।’
এদিন, বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ‘২১ জুলাইকে ব্যবহার করে অনেকে অনেক কিছু করে নিয়েছেন। রাজনৈতিক পদ কিংবা ক্ষমতা নয়, চার্টার্ড ফ্লাইটে ঘোরা। হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটে অনেক সম্পত্তির মালিক হওয়া। ২১ জুলাইকে ব্যবহার করে অনেকে অনেক কিছু করে নিয়েছেন। ২১ জুলাই কী হয়েছিল, এখনও জানে না পশ্চিমবঙ্গের মানুষ।’
অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি সুশান্ত চট্টোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে কমিশন গঠন করা হয়েছিল। এরপর শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ‘বিধানসভা চলায় আমি সেই রিপোর্ট এখানে পেশ করব। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, এন কৃষ্ণমূর্তি, মণীশ গুপ্ত, তুষারকান্তি তালুকদার। কানওয়ালজিৎ সিং, রাজকোমল জুহুরি, দীনেশ বাজপেয়ী, বিমান বসু, প্রদীপ ভট্টাচার্য, মঞ্জুকুমার মজুমদার, কিরণময় নন্দ। শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়, পঙ্কজ বন্দ্যোপাধ্যায়, মদন মিত্র, সৌগত রায়। সব মিলিয়ে ৪৪জনকে কমিশন ডেকেছিল। সবচেয়ে বড় সাক্ষী বলে যিনি দাবি করেন, তাকেই ডাকেনি কমিশন।’
এরপরই নাম প্রকাশ করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘হয়তো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেই দিয়েছিলেন, ডাকবেন না। পঙ্কজ বন্দ্যোপাধ্যায় সাক্ষী দিতে রাজি হননি, জানিয়ে দিয়েছিলেন। ২১ জুলাইয়ে অভিযুক্ত ছিলেন মণীশ গুপ্ত, কিন্তু তাঁকেই মন্ত্রী করা হয়েছিল। তাই স্বভাবতই ওনার নাম আর প্রকাশ করা হয়নি। আইন অনুযায়ী তদন্ত হয়েছিল বলে কমিশন মনে করে না। তদন্ত কমিটির রিপোর্ট, অন্য রিপোর্টের রিপোর্ট অনুপস্থিত ছিল। পুলিশের গুলিতে মৃত্যুর যথার্থতা প্রমাণিত হয় না। কার নির্দেশে পুলিশ গুলি চালিয়েছিল, তাও জানা যায়নি। মহাকরণ থেকে কেন নথি পাওয়া যায়নি, তারও জবাব মেলেনি। বিদ্যুৎমন্ত্রী ফেঁসে যেতে পারেন, তাই তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী তথ্য দেননি। কমিশন মনে করেছে, মহাকরণ থেকে বহু দূরে গুলি চালানোর দরকার ছিল না।’
এই সমস্ত একের পর এক বিস্ফোরক অভিযোগ করার পাশাপাশি মুখ্যমন্ত্রী আজ বিচারপতি সুশান্ত চট্টোপাধ্যায়ের কমিশনের সুপারিশ পাঠ করে জানান ১৯৯৩ সালের ২১শে জুলাই আন্দোলনের নিহতদের পরিবারকে ২৫ লক্ষ টাকা এবং আহতদের 5 লক্ষ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা বলা হলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের পরিবারকে দু লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ এবং আহতদের ১৫ হাজার টাকা করে ক্ষতিপূরণ দিয়েছিল।
এই ঘটনাকে প্রতারণা বলে অভিযোগ করে মুখ্যমন্ত্রী আজ বলেন, ‘রাইটার্স বিল্ডিং কীভাবে গুরুত্ব পূর্ণ নথি সংগ্রহ করতে পারছে না সেটা কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা রাজ্য সরকারের দায়িত্ব। তখন তৃণমূলের সরকার ছিল। ২) এর জন্য আইন সঙ্গত পদক্ষেপ করা উচিত। ৩)মৃত ভুক্তভোগীদের শহিদ হিসাবে গণ্য করা উচিত। ৪) যে ১২ জনকে ময়নাতদন্তের পর শহিদ হিসাবে চিহ্নিত করছে। মৃতদের পরিবারকে ২৫ লক্ষ টাকা আর আহতদের ৫ লক্ষ করে টাকা দেওয়ার সুপারিস করছে। তৃণমূল সরকার মৃতদের ২ লক্ষ টাকা ও আহতের ২৫ হাজার টাকা। লজ্জা করে না! এরপরও আপনারা এই সব করেন। আমি এই রিপোর্ট পেশ করে আহত ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে বলব আপনারা আবার নতুন করে এফ আই আর করতে চান, সেই সুযোগ দেবে। আপনারা যদি চান সেই ক্ষতিপূরণ আমি দেব। আর যাঁরা আপনাদের ব্যবহার করে মন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী হলেন,বিদেশে গেলেন তাঁদের থেকে আপনারা দূরে থাকবেন।’