দীর্ঘদিনের বকেয়া ভাড়া, আদালতের মামলা, শেষমেশ গ্রেফতারি— নিউটাউন (SEO: Newtown) জুড়ে চাঞ্চল্য। অভিযুক্ত বিজেপি (SEO: BJP) নেতাকে ঘিরে জনতার ক্ষোভে সরগরম রাজনৈতিক মহল।
সুষমা পাল মন্ডল। কলকাতা সারাদিন।
নিউটাউন (Newtown)-এর এক বিলাসবহুল আবাসনে বৃদ্ধার ফ্ল্যাট দখল করে বছরের পর বছর থাকার অভিযোগ। সেই অভিযোগেই এবার গ্রেফতার হলেন এক বিজেপি নেতা (BJP Leader Arrest)। আর তাঁকে পুলিশের গাড়িতে তোলার মুহূর্তেই ঘটে চরম নাটকীয় ঘটনা— উত্তেজিত জনতার ডিমবৃষ্টি, ধাক্কাধাক্কি এবং তীব্র বিক্ষোভে কার্যত রণক্ষেত্রের চেহারা নেয় গোটা এলাকা।
দুর্নীতি এবং বেআইনি দখলের বিরুদ্ধে প্রশাসনের ‘জিরো টলারেন্স’ বার্তার আবহে এই গ্রেফতারিকে ঘিরে রাজনৈতিক মহলেও শুরু হয়েছে জোর আলোচনা। একের পর এক হাই-প্রোফাইল অভিযোগের পর এবার বিজেপি নেতার বিরুদ্ধে এমন পদক্ষেপ নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ধৃতের নাম বরুণ বিশ্বাস (Barun Biswas)। তিনি নিউটাউন এলাকার পরিচিত বিজেপি নেতা বলেই স্থানীয় সূত্রের দাবি। অভিযোগ, এলাকার এক আবাসনে বৃদ্ধা অনিতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Anita Bandyopadhyay)-এর মালিকানাধীন ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে বসবাস শুরু করেছিলেন তিনি।
প্রথমদিকে ভাড়ার চুক্তি নিয়মমাফিক চললেও পরে পরিস্থিতি বদলে যায়। বৃদ্ধার অভিযোগ, চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও ফ্ল্যাট খালি করা হয়নি। বরং নানা কারণ দেখিয়ে সময় চাওয়া হয়।
অনিতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি, প্রায় দু’মাস আগে তিনি অভিযুক্তকে ফ্ল্যাট ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ করেন। তখন বরুণ বিশ্বাস নাকি জানান, তাঁর স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা, তাই কিছুটা সময় প্রয়োজন। মানবিক কারণে তিনি সময়ও দিয়েছিলেন বলে দাবি বৃদ্ধার। কিন্তু এরপরও ফ্ল্যাট খালি হয়নি।
অভিযোগ আরও গুরুতর। বৃদ্ধার দাবি, ২০১৯ সালের মার্চ মাসের পর থেকে এক টাকাও ভাড়া দেননি অভিযুক্ত। সেই কারণে কয়েক বছরের বকেয়া ভাড়ার পরিমাণ প্রায় ১৬ লক্ষ টাকায় পৌঁছেছে বলে অভিযোগ। যদিও এই দাবির সত্যতা এখনও আদালত বা তদন্তকারী সংস্থার মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
শুধু তাই নয়, আবাসনের রক্ষণাবেক্ষণ খরচ এবং পুরসভার করও তাঁকেই নিয়মিত বহন করতে হয়েছে বলে জানিয়েছেন অনিতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিষয়টি তিনি আবাসনের পরিচালন সমিতিকেও জানান। সোসাইটির পক্ষ থেকেও ফ্ল্যাট খালি করার অনুরোধ করা হলেও তাতে কোনও ফল হয়নি বলে অভিযোগ।
এরপর তিনি পুলিশের দ্বারস্থ হন। তবে তাঁর অভিযোগ, প্রথমদিকে পুলিশ কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। পরে তৎকালীন স্থানীয় বিধায়ক তাপস চট্টোপাধ্যায় (Tapas Chatterjee)-এর কাছেও লিখিত অভিযোগ জানান। কিন্তু তাতেও সমস্যার সমাধান হয়নি বলে দাবি তাঁর।
শেষ পর্যন্ত ২০২০ সালে আদালতের দ্বারস্থ হন বৃদ্ধা। তাঁর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে মামলা চললেও অভিযুক্ত বারবার আদালতের শুনানিতে অনুপস্থিত থাকায় মামলার অগ্রগতি ব্যাহত হয়েছে। সেই আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যেই শেষমেশ পুলিশের হাতে গ্রেফতার হন বরুণ বিশ্বাস।
তবে গ্রেফতারের সময় পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ পুলিশের সামনে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন। অভিযোগ, অভিযুক্তের দিকে ডিম ছোড়া হয়, ধাক্কাধাক্কির ঘটনাও ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
এই ঘটনার রাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। কারণ, এর আগেও ফ্ল্যাট দখলের অভিযোগে এক তৃণমূল নেতাকে গ্রেফতারের সময় একই ধরনের বিক্ষোভ এবং ডিম নিক্ষেপের ঘটনা সামনে এসেছিল। ফলে এবার বিজেপি নেতার গ্রেফতারিকে ঘিরে রাজনৈতিক মহলে নানা প্রশ্ন উঠছে।
যদিও বরুণ বিশ্বাস বা বিজেপির পক্ষ থেকে এখনও পর্যন্ত এই অভিযোগ নিয়ে কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করা হয়নি। ফলে অভিযোগের বিষয়ে তাঁদের অবস্থান এখনও স্পষ্ট নয়।
পুলিশ জানিয়েছে, অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত চলছে। ফ্ল্যাটের ভাড়ার চুক্তি, আর্থিক লেনদেন, আদালতের নথি এবং সংশ্লিষ্ট সমস্ত তথ্য খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তের ফলাফলের উপর ভিত্তি করেই পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ করা হবে।

একটি ফ্ল্যাটকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই বিতর্ক এখন রাজনৈতিক রঙও পেয়েছে। তদন্ত যত এগোবে, ততই সামনে আসতে পারে নতুন তথ্য। শেষ পর্যন্ত এই মামলার মোড় কোন দিকে ঘুরবে, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।