একসঙ্গে ৩৩ জন IPS আধিকারিকের বদলি, গোয়েন্দা বিভাগ থেকে বারুইপুর—প্রশাসনিক অন্দরে নতুন সমীকরণ, নজরে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সিদ্ধান্ত
কলকাতা: রাজ্য পুলিশের অন্দরে ফের বড়সড় প্রশাসনিক রদবদল। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এবার এক ধাক্কায় ৩৩ জন আইপিএস আধিকারিকের বদলির নির্দেশ জারি হয়েছে। শুধু জেলা বা কমিশনারেট নয়, পরিবর্তন এসেছে রাজ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তদন্তকারী সংস্থাগুলিতেও। সিআইডি (CID), ডিরেক্টরেট অফ ইকোনমিক অফেন্স (Directorate of Economic Offences), স্পেশাল টাস্ক ফোর্স (STF), ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চ (IB)—সব ক্ষেত্রেই নতুন মুখের হাতে দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয়েছে।
এই প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে ঘিরে ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে জোর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক আলোচনা। বিশেষ করে সাম্প্রতিক একাধিক গুরুত্বপূর্ণ তদন্ত এবং আইন-শৃঙ্খলা সংক্রান্ত ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে এই রদবদল যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছে প্রশাসনিক মহল।
সবচেয়ে নজরকাড়া পরিবর্তন হয়েছে বিধাননগর (Bidhannagar) পুলিশ কমিশনারেটে। বর্তমান পুলিশ কমিশনার ত্রিপুরারি অথর্ব-কে সরিয়ে ট্রাফিক ও রোড সেফটির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তাঁর পরিবর্তে রায়গঞ্জ (Raiganj)-এর ডিআইজি অমিত কুমার রাঠোর-কে নতুন পুলিশ কমিশনার হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছে।
অন্যদিকে উত্তরবঙ্গ (North Bengal)-এর এডিজি পদে কর্মরত কে. জয়রামন-কে রাজ্যের ডিরেক্টরেট অফ ইকোনমিক অফেন্স-এর ডিরেক্টর করা হয়েছে। আর্থিক অপরাধ সংক্রান্ত তদন্তে এই সংস্থার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এই নিয়োগকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েই দেখা হচ্ছে।
বড় পরিবর্তন এসেছে রাজ্যের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইডি (CID)-তেও। এতদিন এডিজি সিআইডি হিসেবে কর্মরত সুপ্রতিম সরকার-কে টেলিকমিউনিকেশন শাখায় পাঠানো হয়েছে। তাঁর জায়গায় নতুন গোয়েন্দা প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নিচ্ছেন প্রাক্তন কারা বিভাগের ডিজি নটরাজন রমেশবাবু। ফলে রাজ্যের অপরাধ তদন্ত ও সংবেদনশীল মামলার ভবিষ্যৎ তদন্তে নতুন নেতৃত্বের ছাপ পড়তে পারে বলেই মনে করা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক বারুইপুর (Baruipur)-এর নাবালিকা ধর্ষণ ও খুনের ঘটনাকে ঘিরে রাজ্যজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছিল। সেই ঘটনার তদন্তে একাধিক প্রশাসনিক পদক্ষেপের পর এবার পুলিশ জেলার শীর্ষস্তরেও পরিবর্তন আনা হয়েছে।
পূর্ব মেদিনীপুর (Purba Medinipur) গ্রামীণ এলাকার দায়িত্বে থাকা আইপিএস অতীশ বিশ্বাস-কে বারুইপুর পুলিশ জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছে। অন্যদিকে, ওই জেলার প্রাক্তন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পিনাকী দত্ত-কে জেলা গোয়েন্দা শাখা (DIB)-র দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
এছাড়াও, পশ্চিমাঞ্চল (Western Range)-এর এডিজি বিশাল গর্গ-কে ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চে বদলি করা হয়েছে। এসটিএফ (STF)-এর আইজি প্রবীণ ত্রিপাঠী-কে পাঠানো হয়েছে হোমগার্ড বিভাগের আইজি পদে। অন্যদিকে, কলকাতা পুলিশ (Kolkata Police)-এর সাইবার ক্রাইম বিভাগের ডেপুটি কমিশনার স্পর্শ নীলাঙ্গী-কে এনফোর্সমেন্ট ব্রাঞ্চের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রশাসনিক সূত্রের মতে, নতুন সরকার তদন্তকারী সংস্থাগুলিকে আরও সক্রিয় ও ফলপ্রসূ করে তুলতেই এই পুনর্বিন্যাস করেছে। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মামলার দ্রুত তদন্ত, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং প্রশাসনিক সমন্বয় আরও শক্তিশালী করাই এই সিদ্ধান্তের অন্যতম লক্ষ্য বলে মনে করা হচ্ছে।
একসঙ্গে এত বড় আকারের আইপিএস রদবদল সাধারণ ঘটনা নয়। বিশেষ করে রাজ্যের গোয়েন্দা সংস্থা, অর্থনৈতিক অপরাধ দমন শাখা এবং গুরুত্বপূর্ণ পুলিশ কমিশনারেটগুলিতে নতুন নেতৃত্ব আসায় আগামী দিনে তদন্তের গতি, প্রশাসনিক কৌশল এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে নতুন দিশা দেখা যেতে পারে।
এখন নজর থাকবে নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিকদের দিকে। তাঁরা কত দ্রুত নিজেদের ছাপ ফেলতে পারেন এবং চলমান গুরুত্বপূর্ণ তদন্তগুলিতে কী ধরনের অগ্রগতি আসে, সেটাই আগামী কয়েক সপ্তাহের সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় হতে চলেছে। রাজ্য পুলিশের এই বড় রদবদল কি শুধুই প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস, নাকি এর পিছনে রয়েছে আরও বড় কৌশল? সেই উত্তরই খুঁজছে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহল।