সরকারি টাকায় ‘ঘনিষ্ঠদের বই কেনা’র অভিযোগ, গ্রন্থাগারমন্ত্রীর রিপোর্ট শুনেই তদন্তের নির্দেশ; নতুন করে চড়ল বাংলার রাজনৈতিক পারদ
সুষমা পাল মন্ডল। কলকাতা সারাদিন।
কলকাতা: বইমেলা—যে আয়োজনকে এতদিন বাংলা সংস্কৃতি ও সাহিত্যচর্চার অন্যতম উৎসব হিসেবে দেখা হতো, এবার সেই বইমেলাকেই ঘিরে উঠল কোটি কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ। আর অভিযোগ সামনে আসতেই কড়া অবস্থান নিল রাজ্যের নতুন সরকার। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) স্পষ্ট বার্তা দিলেন—সরকারি অর্থের অপব্যবহারের অভিযোগের কোনও রকম রেয়াত হবে না।
বুধবার সল্টলেক (Salt Lake)-এ বিজেপির জনতার দরবার কর্মসূচি শেষ হওয়ার পর মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন গ্রন্থাগারমন্ত্রী গৌরীশঙ্কর ঘোষ (Gourishankar Ghosh)। সেই বৈঠকেই উঠে আসে একের পর এক বিস্ফোরক অভিযোগ। দাবি করা হয়, তৃণমূল সরকারের আমলে জেলার বিভিন্ন সরকারি বইমেলাকে কেন্দ্র করে সরকারি অর্থে নির্দিষ্ট কিছু প্রকাশক ও ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের বই বিপুল পরিমাণে কেনা হয়েছিল। অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার আর্থিক সুবিধা পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল প্রভাবশালীদের কাছে।
সল্টলেকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে গ্রন্থাগারমন্ত্রী গৌরীশঙ্কর ঘোষের এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন রাজ্য বিজেপির সোশ্যাল মিডিয়া ইনচার্জ সপ্তর্ষি চৌধুরী এবং বিশিষ্ট সাংবাদিক তথা দূরদর্শনের কলকাতা কেন্দ্রের অন্যতম কর্ণধার প্রসেনজিৎ বক্সী।
সূত্রের দাবি, শুধু অভিযোগ শুনেই থেমে থাকেননি মুখ্যমন্ত্রী। অভিযোগকারীদের সঙ্গেও বিস্তারিত আলোচনা করেন তিনি। কোথায়, কীভাবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় সরকারি অর্থ খরচ হয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংগ্রহ করে দ্রুত তদন্তের নির্দেশ দেন গ্রন্থাগারমন্ত্রীকে।
রাজ্যে ক্ষমতার পালাবদলের পর থেকেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছে বিজেপি সরকার। প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েই দায়িত্ব নিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। এবার বইমেলাকে কেন্দ্র করে ওঠা অভিযোগ সেই অবস্থানকেই আরও স্পষ্ট করে দিল।
সরকারি সূত্রে জানা গিয়েছে, ইতিমধ্যেই প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি, কাটমানি এবং সরকারি প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে একটি বিশেষ তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়েছে। অবসরপ্রাপ্ত কলকাতা হাই কোর্ট (Calcutta High Court)-এর বিচারপতি বিশ্বজিৎ বসু (Justice Biswajit Basu)-র নেতৃত্বে গঠিত সেই কমিশনে রয়েছেন প্রাক্তন আইপিএস আধিকারিক জয়রামন (Jayaraman)-সহ একাধিক উচ্চপদস্থ সদস্য। কমিশন ইতিমধ্যেই কাজ শুরু করেছে।
এই পরিস্থিতিতে বইমেলা সংক্রান্ত অভিযোগ সামনে আসায় রাজনৈতিক মহলে নতুন করে চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। কারণ, বইমেলা শুধুমাত্র সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়, সরকারি অনুদান, গ্রন্থাগার, প্রকাশনা এবং শিক্ষা দফতরের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। ফলে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে তার প্রভাব প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক—দুই ক্ষেত্রেই পড়তে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
অভিযোগ অনুযায়ী, বিভিন্ন জেলার সরকারি বইমেলায় বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ ব্যয় করে নির্দিষ্ট কিছু প্রকাশকের বই কেনা হয়েছিল। অভিযোগকারীদের দাবি, বই নির্বাচন বা ক্রয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখা হয়নি। বরং রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা এবং প্রভাব খাটিয়ে সরকারি অর্থের অপব্যবহার করা হয়েছে।
যদিও এই অভিযোগের বিষয়ে এখনও তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া সামনে আসেনি। ফলে অভিযোগের সত্যতা এখন তদন্তের উপরই নির্ভর করছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সরকার যেভাবে একের পর এক পুরনো প্রকল্প ও ব্যয়ের হিসাব খতিয়ে দেখছে, তাতে আগামী দিনে আরও একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ফাইল খুলতে পারে। বিশ্ব বাংলা বাণিজ্য সম্মেলন থেকে শুরু করে বিভিন্ন সরকারি প্রকল্প—ইতিমধ্যেই নানা অভিযোগ সামনে এসেছে। এবার সেই তালিকায় যুক্ত হল সরকারি বইমেলাও।
প্রশাসনিক মহলের একাংশের মতে, এই তদন্ত শুধুমাত্র অতীতের হিসাব খোঁজার জন্য নয়, ভবিষ্যতে সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে আরও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

এখন নজর একটাই—তদন্তে কী উঠে আসে? অভিযোগ কি শুধুই রাজনৈতিক পাল্টা আক্রমণ, নাকি সত্যিই প্রকাশ্যে আসতে চলেছে সরকারি বইমেলার আড়ালে লুকিয়ে থাকা কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের কাহিনি? সেই উত্তরই ঠিক করবে আগামী দিনের রাজনৈতিক বিতর্কের নতুন দিক।