সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
বাংলায় কথা বললেই বাংলাদেশী তকমা কেন? ভারতের মধ্যেই বিভিন্ন বিজেপি শাসিত রাজ্যে গিয়ে বাংলা ভাষায় কথা বললেই গ্রেফতার অথবা আটক করে নির্যাতন করার পাশাপাশি বাংলাদেশের ছেড়ে দিয়ে আসা হচ্ছে কেন? এমন প্রশ্ন তুলে রাজ্য বিধানসভার বিশেষ অধিবেশন আহ্বান করে আনা হলো নিন্দা প্রস্তাব।
ভারতের বিভিন্ন বিজেপি শাসিত রাজ্যে বাংলার পরিযায়ী শ্রমিকদের ওপর লাগাতার হামলার অভিযোগ নিয়ে এবার সরব রাজ্য সরকার। এ নিয়ে বিধানসভায় আনা হলো নিন্দা প্রস্তাব। আজ সোমবার থেকে শুরু হওয়া এই বিশেষ অধিবেশন চলবে ৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। এই দুই দিন ধরে বাংলার প্রতি বঞ্চনা ও বাঙালি শ্রমিকদের ওপর হামলার বিষয়ে দীর্ঘ আলোচনা হবে। সোমবার বেলা ১১টায় বিধানসভার অধিবেশন শুরু হয়। প্রথমে শোক প্রস্তাবের পর সংবিধানের ১৬৯ ধারা অনুযায়ী এই নিন্দা প্রস্তাব আনা হয়। জানা গেছে, মঙ্গল ও বৃহস্পতিবার দুই ঘণ্টা ধরে এই বিষয়ে আলোচনা হবে। মূলত এই প্রস্তাবকে কেন্দ্র করেই তিনদিনের এই বিশেষ অধিবেশন ডাকা হয়েছে।
তবে শুধু এই বিষয় নয়, আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে বিধানসভায় আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে এসআইআর বিরোধিতা এবং নারী সুরক্ষায় অপরাজিতা বিলের বিষয়ে আলোচনা।
রাজ্য বিধানসভায় যে নিন্দা প্রস্তাবনা হয়েছে সেখানে লেখা হয়েছে, যেহেতু, মাতৃভাষা ব্যবহারকারীর সংখ্যায় নিরিখে বাংলা ভাষা বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম ভাষা এবং এশিয়াতে দ্বিতীয়; যেহেতু, ভারতের প্রজাতন্ত্রের সংবিধানের অষ্টম তফসিলে বাংলা ভাষা অন্তর্ভুক্ত এবং ১৯৫০ সালে সংবিধান চালু হওয়ার কাল থেকে বাংলা ভাষা ভারতের সংবিধান স্বীকৃত ভাষা; যেহেতু, ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী, ভারতের মোট জনসংখ্যার ৬.১০ শতাংশ মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলে; যেহেতু, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও আসামের সর্বত্র বহুল ব্যবহৃত সরকারি ভাষা বাংলা এবং ভারতের আসামসহ ঝাড়খণ্ড, বিহার, মেঘালয়, মণিপুর, মিজোরাম, ওড়িশা, হরিয়ানা, দিল্লি, মহারাষ্ট্র এই সমস্ত রাজ্যগুলিতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলে; যেহেতু, বাংলা ভাষায় কথা বলার জন্য ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে বসবাসকারী বাঙালিভাষী মানুষের উপর শারীরিকভাবে আক্রমণ এবং মানসিকভাবে বিরূপতা চালানো হচ্ছে এবং তাদের বিভিন্নভাবে হেনস্থা করা হচ্ছে; যেহেতু, ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে এই রাজ্য থেকে গৃহীত শ্রমিকরা জোরপূর্বক আটক রেখে তাদের পরিবারের সঙ্গে কোনও মোট অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরি করা হচ্ছে এবং তাদের ‘বাংলাদেশি’ তকমা দিয়ে বহিষ্কৃত বাংলাভাষী পাঠানো হচ্ছে;
যেহেতু, দেশের বৃহত্তর অংশের দল দেশের বিভিন্ন রাজ্যে ভাষাভাষী মানুষদের উপর এই অমানবিক আক্রমণ প্রতিপন্ন করেছে ও পরোক্ষভাবে মদত দিচ্ছে এবং বাংলা ভাষাভাষীকে ‘বাংলাদেশি’ বা বিদেশি ভাষা বলে আখ্যা দিয়ে সমস্ত বাংলাভাষী মানুষকে বহিষ্কার বলেই চিহ্নিত করার একটি মূঢ় প্রচেষ্টা চালাচ্ছে; সেইহেতু, এই সভা এই সমস্ত ঘটনা গভীর দুশ্চিন্তা করছে এবং ভাষা-স্বাধীনতা, নিরাপত্তা রক্ষণ ও সুরক্ষা রক্ষা করার স্বার্থে এবং জাতি সমাজের বিস্তৃত স্বার্থে বাংলাভাষী মানুষ ঐক্যবদ্ধ আছে।
স্পিকার বিমান বন্দ্যোপাধ্যায় সব রাজনৈতিক দলের কাছে এই বিষয়ে শান্তিপূর্ণ আলোচনার অনুরোধ করেছেন। তিনি আরও জানান, বৃহস্পতিবার এই অধিবেশনে উপস্থিত থাকবেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শাসক শিবিরের পাশাপাশি বিরোধী দলগুলোও অধিবেশনের জন্য নিজেদের প্রস্তুতি সেরেছে।

এছাড়াও সম্প্রতি প্রকাশিত এসএসসি ২০১৬ সালের বাতিল হওয়া প্যানেলের ‘দাগি’দের তালিকায় শাসক দলের কয়েকজন সদস্যের নাম উঠে এসেছে। এই তালিকায় বিধানসভার মুখ্যসচেতক নির্মল ঘোষের পুত্রবধূর নামও রয়েছে। যদিও নির্মল ঘোষ বিষয়টি নিয়ে বলেছেন, সত্যি-মিথ্যা আদালতে প্রমাণিত হবে। তা সত্ত্বেও বিরোধীরা এই তালিকা নিয়ে বিধানসভায় হইচই করতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে, মঙ্গল ও বৃহস্পতিবারের এই বিশেষ অধিবেশনের দিকে তাকিয়ে রয়েছে রাজ্য।