সুষমা পাল মন্ডল। কলকাতা সারাদিন।
আধার থেকে ব্যাঙ্ক, জমি থেকে ভোটার তথ্য—‘অন্নপূর্ণা যোজনা’র ফর্ম ঘিরে শুরু জোর রাজনৈতিক তরজা
রাজ্যে ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’ নিয়ে এবার নতুন চর্চা শুরু হয়ে গেল। শুধু প্রকল্প ঘোষণা নয়, এবার প্রকাশ্যে এল সেই বহুচর্চিত ১২ পাতার আবেদনপত্রও। আর সেই ফর্মে কী কী তথ্য চাওয়া হয়েছে, তা সামনে আসতেই রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। আধার নম্বর থেকে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট, পরিবারের জমির পরিমাণ থেকে ভোটার তথ্য—সব কিছুই দিতে হবে আবেদনকারীদের।
বুধবার আনুষ্ঠানিকভাবে এই যোজনার ফর্ম প্রকাশ করেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। এরপর থেকেই সাধারণ মানুষের মধ্যে কৌতূহল তুঙ্গে। বিশেষ করে গ্রামের বহু মানুষ জানতে চাইছেন, এই ফর্ম পূরণ করতে ঠিক কী কী কাগজ লাগবে? কী ধরনের তথ্য দিতে হবে? আর কোনও ভুল হলে আবেদন বাতিল হয়ে যাবে কি না?
ইতিমধ্যেই সরকারি ওয়েবসাইটে ফর্ম আপলোড করা হয়েছে। সেখান থেকেই ডাউনলোড করা যাচ্ছে আবেদনপত্র। তবে ফর্ম হাতে পেয়েই অনেকেই কার্যত হতবাক। কারণ, এটি শুধুমাত্র নাম-ঠিকানার সাধারণ আবেদনপত্র নয়, বরং পরিবারের প্রায় প্রতিটি সদস্যের বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়েছে।
ফর্ম অনুযায়ী, প্রথমেই আবেদনকারীর পরিবারের প্রধান বা কর্তার নাম, জন্মতারিখ, আধার নম্বর, রেশন কার্ড নম্বর, ঠিকানা এবং মোবাইল নম্বর দিতে হবে। শুধু তাই নয়, পরিবারের প্রতিটি সদস্যের নাম, তাঁদের সঙ্গে আবেদনকারীর সম্পর্ক, আধার নম্বর এবং পরিচয় সংক্রান্ত তথ্যও উল্লেখ করতে হবে।
এখানেই শেষ নয়। পরিবারের সব সদস্যের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নম্বর এবং IFSC কোড পর্যন্ত জমা দিতে হবে। পাশাপাশি প্রত্যেকের ভোটার কার্ড বা EPIC নম্বর এবং তাঁরা কোন বিধানসভা কেন্দ্রের ভোটার, সেটাও জানতে চাওয়া হয়েছে।
ফর্মের আরও একটি অংশ ঘিরে চর্চা শুরু হয়েছে রাজনৈতিক মহলে। সেখানে পরিবারের সদস্যদের পেশা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, এমনকি শিশুদের কোন স্কুলে পড়াশোনা করে তাও জানাতে বলা হয়েছে। স্বাস্থ্যবিমা আছে কি না, সেটিও উল্লেখ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে ফর্মে থাকা কিছু নির্দিষ্ট প্রশ্ন নিয়ে। আবেদনকারীদের জিজ্ঞাসা করা হচ্ছে—
আপনার বাড়িতে তিন বা তার বেশি পাকা ঘর আছে কি?
পরিবারের মোট জমির পরিমাণ কত?
চার চাকার গাড়ি আছে?
কেউ আয়কর বা পেশাগত কর দেন?
পরিবারের কোনও সদস্য কি মন্ত্রী, সাংসদ, বিধায়ক বা পঞ্চায়েত প্রতিনিধি?
কেউ কি পেনশন পান?
পরিবারের মোট বার্ষিক আয় কত?
বর্তমানে অন্য কোনও সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পাচ্ছেন কি না?
এই প্রশ্নগুলির উত্তর নিয়েই এখন শুরু হয়েছে রাজনৈতিক জল্পনা। বিরোধীদের একাংশের দাবি, এত বিশদ তথ্য চাওয়ার পিছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকতে পারে। যদিও বিজেপির তরফে দাবি করা হয়েছে, প্রকৃত সুবিধাভোগীদের চিহ্নিত করতেই এই তথ্য প্রয়োজন।
ফর্মে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ রয়েছে, যেখানে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বা CAA সংক্রান্ত তথ্য জানতে চাওয়া হয়েছে। আবেদনকারী CAA অনুযায়ী সার্টিফিকেটের জন্য আবেদন করেছেন কি না, কিংবা তাঁর নাম কোনও ট্রাইবুনালে বিচারাধীন রয়েছে কি না, সেটাও উল্লেখ করতে বলা হয়েছে। এই অংশ নিয়েই এখন সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে ফর্ম সংগ্রহ ও আলোচনা। বহু মানুষ বলছেন, এত বড় ফর্ম পূরণ করা সাধারণ গ্রামীণ মানুষের পক্ষে সহজ নয়। বিশেষ করে বয়স্ক বা কম শিক্ষিত মানুষদের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
তবে শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্ট জানিয়েছেন, একদিনে ফর্ম পূরণ করার কোনও তাড়া নেই। সময় নিয়ে ধাপে ধাপে সমস্ত তথ্য সঠিকভাবে পূরণ করতে হবে। তাঁর দাবি, এই প্রকল্পের মাধ্যমে প্রকৃত দরিদ্র পরিবারগুলিকে চিহ্নিত করাই মূল লক্ষ্য।

এদিকে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, লোকসভা ভোটের পর রাজ্যে নতুন করে জনসংযোগ বাড়ানোর কৌশল হিসেবেও এই প্রকল্পকে ব্যবহার করতে পারে বিজেপি। কারণ, সরাসরি পরিবারের আর্থিক ও সামাজিক তথ্য সংগ্রহ ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সমীকরণেও বড় ভূমিকা নিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
ফর্ম ঘিরে এখন যেমন কৌতূহল বাড়ছে, তেমনই বাড়ছে প্রশ্নও। সাধারণ মানুষ কি এত তথ্য দিতে স্বচ্ছন্দ হবেন? নাকি এই নিয়েই শুরু হবে নতুন রাজনৈতিক ঝড়? এখন সেদিকেই নজর রাজ্যের।
https://socialsecurity.wb.gov.in/login- এই ওয়েবসাইট থেকে ফর্ম ডাউনলোড করতে পারবেন।