হুমকির ভিডিয়ো, গা-ঢাকা, পৈলানের ‘রিসর্ট-বাড়ি’তে তল্লাশি—শেষমেশ এসটিএফের জালে ধরা পড়লেন তৃণমূল বিধায়ক
সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
অবশেষে দীর্ঘ খোঁজাখুঁজির পর পুলিশের জালে ধরা পড়লেন দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিষ্ণুপুরের তৃণমূল বিধায়ক দিলীপ মণ্ডল। রাজ্য রাজনীতিতে চাঞ্চল্য ছড়িয়ে, পুরীর একটি হোটেল থেকে তাঁকে আটক করেছে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের স্পেশ্যাল টাস্ক ফোর্স (এসটিএফ) এবং ডায়মন্ড হারবার পুলিশের যৌথ দল। রাতারাতি তাঁকে কলকাতায় নিয়ে আসার প্রস্তুতি শুরু হতেই রাজনৈতিক মহলে তীব্র চাপানউতোর শুরু হয়েছে।
সূত্রের খবর, ওড়িশার পুরীর ‘ব্লু লিলি’ নামে একটি হোটেলে আত্মগোপন করে ছিলেন দিলীপ মণ্ডল। কয়েক দিন ধরেই তাঁর খোঁজে তল্লাশি চালাচ্ছিল পুলিশ। অবশেষে গোপন সূত্রে খবর পেয়ে সেখানে পৌঁছে যায় এসটিএফ। হোটেলের রেজিস্টার খতিয়ে দেখেই নিশ্চিত হন তদন্তকারীরা। তারপরই বিধায়কের ঘরে হানা দিয়ে তাঁকে আটক করা হয়।
ঘটনার সূত্রপাত একটি ভাইরাল ভিডিয়ো ঘিরে। সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সেই ভিডিয়োয়, অভিযোগ অনুযায়ী, বিরোধী দলের কর্মী-সমর্থকদের উদ্দেশে হুমকিমূলক মন্তব্য করতে শোনা যায় দিলীপ মণ্ডলকে। যদিও ওই ভিডিয়োর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করেনি কলকাতা সারাদিন, তবু সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই শুরু হয় বিতর্ক।
এরপরই থানায় অভিযোগ দায়ের হয় বিধায়কের বিরুদ্ধে। পুলিশ জামিন অযোগ্য ধারায় মামলা রুজু করে তদন্ত শুরু করে। তদন্তের অংশ হিসেবেই গত ১৪ মে পৈলানে দিলীপ মণ্ডলের বিলাসবহুল বাড়িতে হানা দেয় পুলিশ। কিন্তু সেখানে তাঁর খোঁজ মেলেনি। স্থানীয়দের দাবি, পুলিশের তল্লাশির খবর পেয়েই আগেভাগে এলাকা ছেড়ে সরে যান তিনি।
তারপর থেকেই কার্যত ‘বেপাত্তা’ ছিলেন বিষ্ণুপুরের বিধায়ক। রাজ্যের একাধিক জায়গায় তাঁর খোঁজে তল্লাশি চালানো হলেও কোনও সূত্র মিলছিল না। অবশেষে পুরীর হোটেলেই তাঁর লুকিয়ে থাকার খবর পায় তদন্তকারী দল।
এই ঘটনায় ইতিমধ্যেই গ্রেফতার হয়েছেন দিলীপ মণ্ডলের ছেলে অর্ঘ্য মণ্ডল। অভিযোগ, এলাকায় অশান্তি ছড়ানো এবং বেআইনি কার্যকলাপের সঙ্গে যুক্ত থাকার সূত্রে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। পুলিশ সূত্রে খবর, গ্রেফতারের সময় তাঁর কাছ থেকে আগ্নেয়াস্ত্রও উদ্ধার হয়েছে। সেই মামলায় আরও চার জনকে গ্রেফতার করেছে এসটিএফ এবং ডায়মন্ড হারবার জেলা পুলিশ।
রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, এই ঘটনা শুধু একটি ফৌজদারি তদন্ত নয়, বরং দক্ষিণ ২৪ পরগনার রাজনৈতিক সমীকরণেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ, দিলীপ মণ্ডল দীর্ঘদিন ধরেই এলাকায় প্রভাবশালী মুখ হিসেবে পরিচিত। ফলে তাঁর বিরুদ্ধে পুলিশের এই কড়া পদক্ষেপ ঘিরে স্বাভাবিকভাবেই বাড়ছে রাজনৈতিক চাপ।

অন্যদিকে, গ্রেফতারির আশঙ্কায় আগেই কলকাতা হাই কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন দিলীপ মণ্ডল। তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া একাধিক এফআইআর খারিজের আবেদনও করেছিলেন তিনি। পাশাপাশি রক্ষাকবচ চেয়েও আদালতের দ্বারস্থ হন। কিন্তু সেই আইনি লড়াই চলাকালীনই পুরীতে গিয়ে তাঁকে আটক করল পুলিশ।

এদিকে পৈলানে তাঁর দুই বাড়িতে পুলিশের তল্লাশি নিয়েও কম চর্চা হয়নি। স্থানীয়দের বক্তব্য, একটি বাড়ি প্রায় রিসর্টের মতো করে সাজানো। বিশাল বাগান, সুইমিং পুল, দোলনা থেকে শুরু করে নানা শৌখিন মূর্তি—সব মিলিয়ে এলাকাবাসীর মধ্যেও সেই বাড়ি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই কৌতূহল ছিল।
এখন প্রশ্ন একটাই—পুরী থেকে কলকাতায় আনার পর দিলীপ মণ্ডলকে কি গ্রেফতার দেখানো হবে? নাকি আইনি লড়াইয়ে নতুন মোড় আসবে? দক্ষিণ ২৪ পরগনার রাজনীতিতে এই নাটকীয় অধ্যায়ের পর এবার নজর সবার আদালত আর পুলিশের পরবর্তী পদক্ষেপে।