‘আমাকে প্রাণে মেরে ফেলতে চায়’, বিস্ফোরক অভিযোগ অভিষেকের; আদালতে যাওয়ার হুঁশিয়ারি, পুলিশের ভূমিকা নিয়েও তোলা হল বড় প্রশ্ন
সুষমা পাল মন্ডল। কলকাতা সারাদিন।
রাজ্যের রাজনৈতিক উত্তাপ যে নতুন মাত্রা নিতে চলেছে, তার ইঙ্গিত মিলেছিল আগেই। কিন্তু শনিবার দক্ষিণ ২৪ পরগনার সোনারপুরে যা ঘটল, তা ঘিরে এখন তোলপাড় গোটা বাংলা।
ভোট-পরবর্তী হিংসায় নিহত এক দলীয় কর্মীর পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে নজিরবিহীন বিক্ষোভের মুখে পড়লেন তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক তথা ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। অভিযোগ, তাঁর গাড়ি ঘিরে বিক্ষোভ দেখানো হয়, ছোড়া হয় ডিম, জুতো, পাথর। এমনকি তাঁর পোশাক টেনে ছিঁড়ে দেওয়া এবং শারীরিক হেনস্থারও অভিযোগ উঠেছে।
ঘটনার জেরে মুহূর্তের মধ্যে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে সোনারপুরের রাজনৈতিক পরিবেশ। চারদিক থেকে ভেসে আসে ‘চোর-চোর’ স্লোগান। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছয় যে, নিজের নিরাপত্তার কথা ভেবে শেষ পর্যন্ত মাথায় ক্রিকেট হেলমেট পরে এগোতে হয় অভিষেককে।
শনিবার বিকেলে নিহত তৃণমূল কর্মী সঞ্জু কর্মকারের পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে সোনারপুরে পৌঁছনোর কথা ছিল তাঁর। কিন্তু পথেই শুরু হয় বিক্ষোভ। প্রথমে চারচাকা গাড়িতে যাওয়ার চেষ্টা করলেও পরিস্থিতি প্রতিকূল দেখে একটি মোটরবাইকে চড়ে গন্তব্যে পৌঁছনোর উদ্যোগ নেন তিনি।
কিন্তু তাতেও পরিস্থিতি শান্ত হয়নি। অভিযোগ, বিক্ষোভকারীরা তাঁর গতিপথ আটকে দেয়। এরপর শুরু হয় ডিম ও জুতো ছোড়া। ভিড়ের চাপে একসময় তাঁর পরনের সাদা শার্টের বোতাম ছিঁড়ে যায়। ভেঙে যায় চশমাও।
এই ঘটনার পর সংবাদমাধ্যমের সামনে এসে তীব্র ক্ষোভ উগরে দেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি সরাসরি বলেন, “এরা আমাকে প্রাণে মেরে ফেলতে চায়।”
অভিষেকের দাবি, পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ ছিল যে তাঁর মাথায় গুরুতর চোট লাগতে পারত।
তিনি বলেন, “আমার মাথা দু’টুকরো হয়ে যেত আজকে। আমার সঙ্গে দু’তিনজন মহিলা সহকর্মী এসেছেন। তাঁদের লাথি মেরে রাস্তায় ফেলে দেওয়া হচ্ছে। এটা বাঙালির সংস্কৃতি? আমার দলের একজন কর্মী মারা গিয়েছে। আমি সেই বাড়িতে দেখা করতে আসতে পারি না? আমার চোখে সাত বার অস্ত্রোপচার হয়েছে। ইট-পাটকেল ছুড়েছে। চশমার অবস্থা দেখুন। বিজেপি যদি এর সঙ্গে জড়িত না থাকে, তা হলে বিজেপি পদক্ষেপ করছে না কেন? আমি এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে হাই কোর্টেও যাব। সুপ্রিম কোর্টেও যাব।”
এরপর আরও বিস্ফোরক অভিযোগ তোলেন তৃণমূলের এই শীর্ষ নেতা। তাঁর দাবি, গোটা ঘটনাই পরিকল্পিত এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
অভিষেক বলেন, “এই সমস্ত কিছুই আসলে বিজেপি স্পনসরড (BJP sponsored)। দেখুন ওরা কী কাণ্ড ঘটিয়েছে! এটাই ওদের গণতন্ত্রের নমুনা। রাজ্যে নতুন সরকার গঠনের এক মাসও কাটেনি, অথচ সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার কোনো বালাই নেই, পুলিশকেও কোথাও দেখা যাচ্ছে না।”
তবে সোনারপুরের সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ আনেননি তিনি। বরং স্থানীয় বাসিন্দাদের সম্পূর্ণভাবে দায়মুক্তি দিয়ে দাবি করেন, বহিরাগতদের এনে এই বিক্ষোভ সংগঠিত করা হয়েছে।
তাঁর কথায়, স্থানীয় মানুষ তাঁকে বাধা দেননি, বরং অনেকেই সহযোগিতা করেছেন। রাজনৈতিক স্বার্থে আগে থেকেই কিছু লোককে এলাকায় ঢোকানো হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
ঘটনার সবচেয়ে নাটকীয় মুহূর্ত তৈরি হয় তখন, যখন ডিম ও জুতোর আঘাত এড়াতে মাথায় ক্রিকেট হেলমেট পরে রাস্তায় হাঁটতে দেখা যায় অভিষেককে। সেই ছবি মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় এবং রাজনৈতিক মহলে শুরু হয় জোর বিতর্ক।
সব বাধা পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত নিহত কর্মী সঞ্জু কর্মকারের বাড়িতে পৌঁছন তিনি। সেখানে গিয়ে বৃদ্ধ বাবা-মায়ের পাশে বসেন। তখনও তাঁর পোশাক এলোমেলো, চশমা ক্ষতিগ্রস্ত।
সেখানেই আবেগঘন সুরে অভিষেক বলেন, “মাথাটা বেঁচে গিয়েছে শুধু হেলমেটটা মাথায় ছিল বলে। ওরা আমার চশমা ভেঙে দিয়েছে। আমি না হয় কোনও রকমে একই ভাবে এখান থেকে বেরিয়ে গেলাম, কিন্তু এর পর তো সঞ্জু কর্মকারের এই বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ওপর চড়াও হবে ওই বখাটেরা। ওরা আমায় মারতে চায়? মেরে দিক! কিন্তু আমি এখান থেকে কোথাও যাব না। সঞ্জুর বাবা-মাকে ছেড়ে নড়ব না।”

প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও তীব্র প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, কর্মসূচির বিষয়ে আগাম তথ্য দেওয়া সত্ত্বেও পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েন ছিল না। কেন নিরাপত্তার ঘাটতি রইল, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সাংসদ।
পাশাপাশি তিনি জানান, এই ঘটনায় আইনি লড়াইয়ের পথেও হাঁটবেন। কলকাতা হাইকোর্ট থেকে শুরু করে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত যাওয়ার কথাও স্পষ্ট করেছেন তিনি।
দিনের শেষে সোনারপুরের এই ঘটনা শুধু একটি রাজনৈতিক বিক্ষোভ নয়, রাজ্যের ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠা রাজনৈতিক পরিস্থিতিরও বড় ইঙ্গিত বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহলের একাংশ। ডিম, জুতো, হেলমেট আর বিস্ফোরক অভিযোগে ঘেরা এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এখন শুরু হয়েছে নতুন রাজনৈতিক সংঘাত।
আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এই ঘটনার পর বাংলার রাজনীতিতে কি আরও বাড়বে সংঘাতের তাপ, নাকি শুরু হবে নতুন রাজনৈতিক লড়াইয়ের অধ্যায়? সেই উত্তরই এখন খুঁজছে গোটা রাজ্য।