প্রিয়াঙ্কা মান্না। কলকাতা সারাদিন।
বনিতা সান্ধুকে এখন দেখলে একটা কথাই মনে হয়—তিনি ভীষণভাবে নিজের সঙ্গে সংযুক্ত। মুম্বইয়ে ফিরে আসার পর তাঁর জীবন যেন একটু ধীর, কিন্তু অনেক বেশি গভীর। আন্তর্জাতিক কাজ, নতুন ছবি, কেরিয়ারের চাপ—সবকিছুর মধ্যেও তিনি এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন নিজের শরীর আর মনের ভারসাম্যে। সাম্প্রতিক এক কথোপকথনে বনিতা খোলাখুলি জানিয়েছেন, কীভাবে ছোট ছোট অভ্যাস বদলে দিয়েছে তাঁর স্নায়ু, এনার্জি আর মানসিক শান্তি।
দিনের শুরুটাই এখন আগের মতো নয়। ঘুম ভেঙেই ফোন হাতে নেওয়ার অভ্যাস ছেড়েছেন বনিতা। তার বদলে শুরু হয় জার্নালিং দিয়ে। ‘দ্য আর্টিস্ট ওয়ে’ (The Artist’s Way) কোর্সের অংশ হিসেবে প্রতিদিন সকালে নিজের ভাবনা, ভয়, স্বপ্ন—সব কিছু লিখে ফেলেন তিনি। বনিতার কথায়, এতে মাথার ভেতরের অস্থিরতা অনেকটাই কমে যায়। দিনের শুরুতেই যেন মানসিক বোঝা হালকা হয়ে যায়, যা তাঁর সৃজনশীল কাজেও সরাসরি প্রভাব ফেলে।
সকালের পানীয় হিসেবেও বড় বদল এনেছেন তিনি। কফির বদলে এখন তাঁর দিন শুরু হয় একেবারে দেশি উপায়ে—গরম জলে হলুদ, আদা, এলাচ, দারুচিনি আর সামান্য মধু। এই পানীয় শরীর গরম রাখে, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং ত্বকের জন্যও ভালো কাজ করে বলে মনে করেন বনিতা। এর প্রায় এক ঘণ্টা পর তিনি খান প্রোটিন-সমৃদ্ধ ব্রেকফাস্ট। সাধারণত ডিম থাকে তালিকায়। আগে ফল বা পোরিজ খেলেও তাতে তাঁর শরীর দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ত। এখন তিনি এমন খাবার বেছে নিচ্ছেন, যা দীর্ঘ সময় এনার্জি ধরে রাখে।
ফিটনেস নিয়ে বনিতার দৃষ্টিভঙ্গিতেও এসেছে বড় পরিবর্তন। একসময় দৌড়, কার্ডিও আর অতিরিক্ত এক্সারসাইজেই ভরসা রাখতেন তিনি। এখন সেখানে জায়গা নিয়েছে স্ট্রেংথ ট্রেনিং আর যোগ। সপ্তাহে চার দিন ওজন নিয়ে ট্রেনিং, দু’দিন যোগ—এই রুটিনেই তিনি সবচেয়ে স্বচ্ছন্দ। এর পাশাপাশি হাঁটাও তাঁর প্রিয় ব্যায়াম। বিশেষ করে ইউরোপ বা আমেরিকায় থাকলে প্রকৃতির মধ্যে হাঁটতে খুব ভালোবাসেন বনিতা। তাঁর মতে, হাঁটার সময় শরীরের পাশাপাশি মনও ধীরে ধীরে শান্ত হয়।

নারী শরীর নিয়ে বনিতার ভাবনাচিন্তা বেশ বাস্তবসম্মত। তিনি স্পষ্ট বলেন, নারীদের শরীর কোনও মেশিন নয়। মাসিক হরমোন সাইকেলের সঙ্গে শরীরের এনার্জি, মনোভাব, এমনকি খাবারের চাহিদাও বদলায়। কোন সপ্তাহে কতটা কাজ করা উচিত, কী খাওয়া দরকার—সবটাই সেই অনুযায়ী বদলানো প্রয়োজন। নিজের কৈশোরের কথা বলতে গিয়ে বনিতা স্বীকার করেন, তখন এই জ্ঞান থাকলে তিনি অনেক শারীরিক ও মানসিক সমস্যার হাত থেকে বাঁচতে পারতেন।
তাঁর জীবনের সবচেয়ে আলোচিত পরিবর্তন অবশ্যই কফি ছেড়ে দেওয়া। ছোটবেলা থেকেই সকালে কফি ছাড়া বনিতার দিন শুরু হত না। কিন্তু একটি মেডিটেশন কোর্সে যোগ দেওয়ার সময় তাঁকে পুরোপুরি ক্যাফেইন বন্ধ করতে হয়। শুরুতে বিষয়টি কঠিন ছিল, মাথাব্যথা, অস্থিরতাও হয়েছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে তিনি বুঝতে পারেন, কফি ছাড়ার ফলে তাঁর নার্ভাস সিস্টেম অনেক বেশি শান্ত হয়েছে। আগের মতো অযথা উদ্বেগ বা টেনশন আর নেই। এখন ভোর ৪টেয় শুটিং থাকলেও কফি ছাড়াই তিনি নিজেকে সতেজ অনুভব করেন। মাঝে মধ্যে ম্যাচা খেলেও কফিতে আর ফিরতে চান না।
খাবার নিয়ে বনিতা কোনও কড়া নিয়মে বিশ্বাসী নন। তিনি ক্যালোরি গোনেন না, নিজেকে বঞ্চিতও করেন না। মিষ্টির প্রতি তাঁর দুর্বলতা আজও আছে। স্ট্রবেরি আর গলানো চকোলেট তাঁর প্রিয়। তবে চিনি খাওয়ার ক্ষেত্রে তিনি সচেতন। সাধারণ চিনি এড়িয়ে গুড়, স্টেভিয়া বা প্রাকৃতিক সুইটনার ব্যবহার করেন।
ত্বকের যত্ন নিয়েও বনিতার দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা। বাইরের প্রোডাক্টের চেয়ে শরীরের ভেতর থেকে যত্ন নেওয়াকেই তিনি বেশি গুরুত্ব দেন। নিয়মিত ইলেক্ট্রোলাইট খাওয়ার ফলে তাঁর ত্বক, এনার্জি লেভেল আর মনোযোগ—সবকিছুই উন্নত হয়েছে বলে মনে করেন তিনি। কাজ না থাকলে মেকআপ এড়িয়ে চলেন এবং রাতে কখনও মেকআপ না তুলে ঘুমোন না—এ ব্যাপারে তিনি খুবই কড়া।
কাজের দিক থেকেও বনিতার সামনে নতুন অধ্যায়। ওটিটি প্ল্যাটফর্মে মুক্তি পেতে চলেছে তাঁর ছবি ‘মাদার টেরেজা’ (Mother Teresa)। ছবিটি তাঁর কাছে বিশেষ কারণ এর আয়ের একটি বড় অংশ দান করা হবে নারী ও শিশুদের জন্য। ছবিতে বনিতা অভিনয় করেছেন এক আধুনিক নারীর চরিত্রে—যিনি জীবনে বিশ্বাস হারিয়ে আবার তা ফিরে পাওয়ার পথে হাঁটেন। বনিতার মতে, এই গল্প অনেকের মন ছুঁয়ে যাবে।
সব মিলিয়ে বনিতা সান্ধুর ফিটনেস ও জীবনদর্শন একটাই বার্তা দেয়—বড় পরিবর্তনের জন্য বড় ত্যাগ নয়, বরং ছোট অভ্যাসই যথেষ্ট।