শৌনক মন্ডল। কলকাতা সারাদিন।
ভারতের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কনীতির সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন নতুনভাবে ভারতে একাধিক পণ্যের উপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করেছে, যার প্রভাব ইতিমধ্যেই দেখা যাচ্ছে ভারতীয় বাজারে। এতে শুধু ভারতের রফতানি খাতে ধাক্কা নয়, বরং বাড়ছে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারেও দাম।
কোন কোন পণ্যে বাড়ছে দাম?
আমেরিকার নতুন শুল্ক নীতির ফলে মূলত ছয়টি প্রধান খাত সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হবে:
1. বস্ত্র ও পোশাক শিল্প (Textiles & Apparel) – $10.3 বিলিয়ন
2. রত্ন ও গহনা (Gems & Jewellery) – $12 বিলিয়ন
3. চিংড়ি রফতানি (Shrimp exports) – $2.24 বিলিয়ন
4. চামড়া ও জুতা (Leather & Footwear) – $1.18 বিলিয়ন
5. রাসায়নিক শিল্প (Chemicals) – $2.34 বিলিয়ন
6. যন্ত্রপাতি (Machinery) – $9 বিলিয়ন
এই পণ্যে অতিরিক্ত আমদানি শুল্ক আরোপ করায় ভারতের রফতানি খরচ বেড়ে যাচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে পণ্যের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার উপর। পাশাপাশি এই পণ্যের চাহিদাও কমে যাচ্ছে মার্কিন বাজারে, যার প্রভাব পড়বে ভারতের MSME এবং কর্মসংস্থানের ওপর।
কোন কোন পণ্যে কত শতাংশ শুল্ক?
থিঙ্ক ট্যাঙ্ক GTRI-এর একটি রিপোর্ট অনুসারে, নিম্নলিখিত পণ্যে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা হয়েছে:
জৈব রাসায়নিক (Organic Chemicals) – ৫৪%
কার্পেট ও হস্তশিল্প – ৫২.৯%
নিটেড গার্মেন্টস (Knitwear) – ৬৩.৯%
গয়না ও হীরা – ৫২.১%
যন্ত্রপাতি – ৫১.৩%
এই শুল্কগুলি পূর্বে আরোপিত আমেরিকার সাধারণ আমদানি শুল্কের উপর অতিরিক্ত হিসেবে যুক্ত হবে।
দাম বাড়বে ভারতের বাজারেও
চামড়া, গয়না, পোশাক, রাসায়নিক ইত্যাদি রফতানিকারক সংস্থাগুলি আমেরিকায় রফতানি কমাতে বাধ্য হচ্ছে। এর ফলে ভারতীয় বাজারে পণ্যের অতিরিক্ত সাপ্লাই তৈরি হচ্ছে, তবে উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় দাম কমছে না—বরং আরও বাড়ছে।
বিশেষ করে সোনা, হীরা, ও চামড়ার পণ্যে এর প্রভাব সুস্পষ্ট।
আসবাবপত্র, চামড়ার ব্যাগ, হ্যান্ডমেড কার্পেট, পোশাক ইত্যাদি পণ্যের দাম এখন ২০-৩০% পর্যন্ত বাড়তে পারে।
কর্মসংস্থানের ওপর বড় প্রভাব
ভারতের টেক্সটাইল ও হ্যান্ডলুম সেক্টরে লাখ লাখ মানুষ কাজ করেন। এসব খাতে রফতানি কমে গেলে সরাসরি প্রভাব পড়বে কর্মসংস্থানের ওপর।
Confederation of Indian Textile Industry (CITI) বলেছে, এই সিদ্ধান্ত ভারতের পোশাক শিল্পের জন্য একটি বড় ধাক্কা।
কামা জুয়েলারির এমডি কলিন শাহ বলেন: “ভারতের প্রায় ৫৫% রত্ন ও গয়নার রফতানি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রমুখী। ৫০% অতিরিক্ত শুল্কে দাম অনেক বেড়ে যাবে, এবং অনেক অর্ডার ইতিমধ্যেই বাতিল হয়েছে।”
চিংড়ি শিল্প মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত
মেগা মোডার (কলকাতা)-র এমডি যোগেশ গুপ্তা জানিয়েছেন, “ভারতীয় চিংড়ি ইতিমধ্যেই ২.৪৯% অ্যান্টি ডাম্পিং ও ৫.৭৭% কাউন্টারভেইলিং ডিউটির আওতায়। এখন ২৫% অতিরিক্ত শুল্কে মোট ৩৩.২৬% হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে ইকুয়েডরের মতো দেশগুলির সঙ্গে প্রতিযোগিতা অসম্ভব, যারা কেবল ১৫% শুল্ক দেয়।”
ভারতের অবস্থান ও ভবিষ্যতের সম্ভাবনা
বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের এই পদক্ষেপ একতরফা ও বৈষম্যমূলক, কারণ চীন ও তুরস্কের মতো দেশগুলোকে এইভাবে শাস্তি দেওয়া হয়নি, যদিও তারাও রাশিয়া থেকে তেল আমদানি করছে।
২০২৪-২৫ সালে ভারত-আমেরিকা দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল $১৩১.৮ বিলিয়ন, যার মধ্যে ভারত রফতানি করেছে $৮৬.৫ বিলিয়ন। এই বিশাল রফতানির একটি বড় অংশ ঝুঁকিতে পড়ছে।
গ্রোমর ইন্টারন্যাশনাল (কানপুর)-এর এমডি যাদুবেন্দ্র সিং সাচান বলেন: “ভারতের উচিত এখন বিকল্প বাজার খোঁজা। আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপের দিকে নজর দেওয়া দরকার। এছাড়া ভারত-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি দ্রুত সম্পন্ন হওয়া দরকার।”
US tariff impact on Indian exports এখন শুধুমাত্র আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বিষয় নয়—এটি সরাসরি প্রভাব ফেলছে ভারতীয় অর্থনীতি, মূল্যস্ফীতি ও কর্মসংস্থান-এর উপর। সরকারের উচিত এখনই দ্রুত হস্তক্ষেপ করে প্রভাবিত শিল্পগুলিকে স্বল্পমেয়াদী প্রণোদনা ও বিকল্প বাজারে প্রবেশে সহায়তা করা।