দূষণ রুখতে ট্রামই ভরসা! গড়িয়াহাটে কর্মসূচির পর চাঙ্গা ট্রামপ্রেমীরা, রাজনৈতিক মহলেও বাড়ছে সমর্থন
সুষমা পাল মন্ডল। কলকাতা সারাদিন।
কলকাতার পরিচয় বলতে এখনও অনেকের চোখে ভেসে ওঠে হলুদ ট্যাক্সি, হাওড়া ব্রিজ আর ট্রাম। কিন্তু সেই ট্রাম আজ কার্যত ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই নিতে বসেছে। একসময় শহরের রাস্তাজুড়ে ছুটে বেড়ানো ট্রামের সংখ্যা এখন হাতে গোনা। আর সেই বাস্তবতার মধ্যেই নতুন করে জোরালো হচ্ছে এক পুরনো দাবি—কলকাতার ট্রামকে ফিরিয়ে আনতে হবে তার স্বমহিমায়।
শহরের পরিবেশ রক্ষা, দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণের স্বার্থে ট্রামের পুনরুজ্জীবনের দাবি তুলেছে ক্যালকাটা ট্রাম ইউজার অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনের সদস্যদের বক্তব্য, আজ যখন বিশ্বের বড় বড় শহর পরিবেশবান্ধব গণপরিবহণের দিকে ঝুঁকছে, তখন কলকাতার ট্রামকে পিছনে ফেলে দেওয়া কোনওভাবেই যুক্তিযুক্ত নয়।
এক সময় কলকাতায় প্রায় ৩৫টিরও বেশি রুটে ট্রাম চলত। শহরের উত্তর থেকে দক্ষিণ, পূর্ব থেকে কেন্দ্র—সব জায়গাতেই ছিল ট্রামের উপস্থিতি। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই নেটওয়ার্ক সঙ্কুচিত হতে হতে এখন কার্যত দুইটি রুটে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। গড়িয়াহাট-ধর্মতলা এবং শ্যামবাজার-ধর্মতলা রুটে চলা ট্রাম এখন যেন শুধুই অতীতের স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রেখেছে।
তবে ট্রামপ্রেমীরা বলছেন, ট্রাম শুধুই একটি যানবাহন নয়। এটি কলকাতার সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই ট্রামকে শুধুমাত্র নস্টালজিয়ার বিষয় হিসেবে না দেখে ভবিষ্যতের পরিবেশবান্ধব পরিবহণ ব্যবস্থা হিসেবেও ভাবা উচিত।
সম্প্রতি গড়িয়াহাটে একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ক্যালকাটা ট্রাম ইউজার অ্যাসোসিয়েশন। সেখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। সংগঠনের দাবি, বিজেপি ও বামপন্থী প্রতিনিধিরা ট্রামের পুনরুজ্জীবনের পক্ষে মত প্রকাশ করেছেন।
ট্রামপ্রেমীদের আশা আরও বেড়েছে একটি বিশেষ কারণে। তাঁদের দাবি, অতীতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও কলকাতার ট্রাম ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ এবং উন্নয়নের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেছিলেন। সেই সূত্র ধরেই এখন নতুন সরকারের কাছে একটি বিস্তারিত প্রস্তাব পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে সংগঠন।
ক্যালকাটা ট্রাম ইউজার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি দেবাশিস ভট্টাচার্য মনে করছেন, রাজনৈতিক স্তরে এখন ট্রাম নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তাঁর কথায়, “যদি মেট্রো এবং ই-বাস পরিবেশবান্ধব পরিবহণ হিসেবে গুরুত্ব পায়, তাহলে ট্রাম কেন নয়? ট্রাম তো বহু আগে থেকেই সবুজ পরিবহণের উদাহরণ।”
সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মহাদেব শী আবার আন্তর্জাতিক উদাহরণ তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, ফ্রান্স, জার্মানি, সুইজারল্যান্ডের মতো দেশে আধুনিক শহর পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ট্রাম। কলকাতাতেও সেই ভাবনাকে বাস্তব রূপ দেওয়া সম্ভব।
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন ১৯৯৬ সালের একটি ঘটনা। সেই সময় অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নের ট্রামচালক রোবার্তো ডি অ্যান্দ্রিয়ো কলকাতার ট্রাম দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন। মহাদেবের মতে, বিশ্বের পর্যটকদের কাছেও কলকাতার ট্রাম একটি বড় আকর্ষণ হতে পারে। সঠিক পরিকল্পনা থাকলে ট্রামকে ঘিরে নতুন পর্যটন অর্থনীতিও গড়ে উঠতে পারে।
শুধু তাই নয়, ট্রামকে কেন্দ্র করে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, হেরিটেজ ট্যুর এবং বিশেষ প্রচারাভিযানের দাবিও তুলেছেন তাঁরা। তাঁদের লক্ষ্য, নতুন প্রজন্মের কাছে ট্রামকে আবার জনপ্রিয় করে তোলা।

এখন প্রশ্ন একটাই—নতুন সরকার কি সত্যিই ট্রামের হারিয়ে যাওয়া লাইনগুলো ফিরিয়ে আনার পথে হাঁটবে? ধর্মতলা থেকে শহরের বিভিন্ন প্রান্তে কি আবার শোনা যাবে ট্রামের সেই চেনা ঘণ্টাধ্বনি?
কলকাতার বহু মানুষের চোখ এখন সেই সিদ্ধান্তের দিকেই। কারণ ট্রাম ফিরলে শুধু একটি যানবাহন নয়, হয়তো ফিরবে শহরের হারাতে বসা এক টুকরো আত্মাও। আর সেই প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষাতেই আজ প্রহর গুনছে ট্রামপ্রেমী কলকাতা।