লক্ষ্মীর ভান্ডারের বদলে নতুন প্রকল্প, অনলাইন-অফলাইন দু’ভাবেই আবেদন… মা ক্যান্টিনে ৫ টাকায় এবার মাছ-ভাতও! রাজনৈতিক বার্তায় সরব শুভেন্দু অধিকারী

রাজ্যের রাজনীতিতে ফের বড়সড় চমক। একদিকে নতুন সামাজিক প্রকল্প ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’, অন্যদিকে মা ক্যান্টিনে মাছ-ভাত— কল্যাণীর প্রশাসনিক বৈঠক থেকে একের পর এক ঘোষণা করে কার্যত রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়িয়ে দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।

সবচেয়ে বড় খবর, বুধবার থেকেই আনুষ্ঠানিক ভাবে প্রকাশিত হতে চলেছে অন্নপূর্ণা যোজনার ফর্ম। শুধু তাই নয়, অফলাইনের পাশাপাশি অনলাইনেও আবেদন করার সুযোগ থাকবে বলে স্পষ্ট জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। ফলে লক্ষ লক্ষ উপভোক্তার নজর এখন নবান্নের দিকেই।

মঙ্গলবার কল্যাণীর এপিজে আব্দুল কালাম প্রেক্ষাগৃহে উত্তর ২৪ পরগনা, নদিয়া ও হুগলি জেলার প্রশাসনিক কর্তাদের নিয়ে বৈঠক করেন শুভেন্দু। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি জানান, রাজ্যের একাধিক পুরনো প্রকল্পকে নতুন কাঠামোয় আনার প্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছে।

শুভেন্দুর কথায়, “লক্ষ্মীর ভান্ডারকে অন্নপূর্ণা যোজনা এবং স্বাস্থ্যসাথীকে আয়ুষ্মান ভারতে রূপান্তরের কাজ চলছে। বুধবার নবান্ন থেকে আনুষ্ঠানিক ভাবে ফর্ম প্রকাশ করা হবে।”

মুখ্যমন্ত্রী জানান, এই প্রকল্পের সুবিধা পেতে গেলে নির্দিষ্ট ফর্ম পূরণ বাধ্যতামূলক। সেই ফর্ম প্রকাশের সময় উপস্থিত থাকবেন সংশ্লিষ্ট দফতরের মন্ত্রী, মুখ্যসচিব, অর্থসচিব-সহ শীর্ষ আধিকারিকরা। বিজেপি বিধায়ক অগ্নিমিত্রা পালও থাকবেন অনুষ্ঠানে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, আবেদন প্রক্রিয়াকে সাধারণ মানুষের কাছে সহজ রাখতে এবার ডিজিটাল ব্যবস্থার উপরেও জোর দিচ্ছে সরকার। শুভেন্দু স্পষ্ট বলেন, “অফলাইনের পাশাপাশি অনলাইনেও ফর্ম পূরণ করা যাবে।”

শুধু তাই নয়, প্রশাসনকেও মাঠে নামানো হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, বিডিওদের নেতৃত্বে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ফর্ম পূরণে সাহায্য করবেন সরকারি কর্মীরা। পাশাপাশি বিধায়কদেরও দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে সাধারণ মানুষকে সাহায্য করার।

রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে সরাসরি বুথস্তরে সংগঠন ও প্রশাসনকে একসঙ্গে সক্রিয় করার বার্তাও দিল সরকার।

তবে এখানেই থামেননি শুভেন্দু। অন্নপূর্ণা যোজনা নিয়ে বক্তব্য রাখতে গিয়ে নাগরিকত্ব ইস্যুতেও কড়া বার্তা দেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “ভারতীয় নাগরিকরাই এই সুবিধা পাবেন। যাঁরা এ দেশের নাগরিক নন, তাঁরা এই প্রকল্পের আওতায় আসবেন না।”

বাংলাদেশ থেকে আসা অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের উদ্দেশে ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করে তিনি আরও বলেন, “ভারত সরকারের টাকা অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের জন্য নয়।”

এই মন্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক মহলে ইতিমধ্যেই জোর চর্চা শুরু হয়েছে। বিরোধীরা একে ভোটের আগে ‘রাজনৈতিক মেরুকরণের চেষ্টা’ বলেই কটাক্ষ করতে শুরু করেছে। যদিও সরকারপক্ষের দাবি, প্রকল্পের স্বচ্ছতা বজায় রাখতেই এই অবস্থান।

এদিকে প্রশাসনিক সূত্রে খবর, আগামী ১ জুন থেকেই নতুন প্রকল্পের টাকা উপভোক্তাদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পাঠানোর প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। যদিও যাচাইকরণ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত পুরনো ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’-এর টাকা বন্ধ হবে না বলেও আশ্বাস দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।

অর্থাৎ, যাঁরা এখনও নতুন ফর্ম পূরণ করতে পারেননি, তাঁরাও আপাতত আগের নিয়মে টাকা পেতে থাকবেন। এই ঘোষণায় অনেকটাই স্বস্তিতে সাধারণ মানুষ।

Suvendu on candidate list : ‘২৬শের নির্বাচন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিসর্জন, প্রার্থী তালিকা এবার গৌণ’ হুঙ্কার শুভেন্দুর

তবে দিনের আরেকটি বড় চমক ছিল মা ক্যান্টিন নিয়ে।
৫ টাকায় খাবারের প্রকল্পে এবার যোগ হচ্ছে মাছ-ভাত!

শুভেন্দু ঘোষণা করেন, “সপ্তাহে দু’দিন মা ক্যান্টিনে মাছ-ভাত দেওয়া হবে। দাম থাকবে ৫ টাকাই।” বাকি দিনগুলোতে আগের মতোই ডিম-ভাত মিলবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলার খাদ্যসংস্কৃতিকে মাথায় রেখেই এই পদক্ষেপ। বিশেষ করে শহর ও শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে এর প্রভাব পড়তে পারে বলেই মনে করা হচ্ছে।

এছাড়াও মুখ্যমন্ত্রী জানান, ‘দিদিকে বলো’ পরিষেবার নাম বদলে এবার করা হচ্ছে ‘আপনার সরকারকে বলুন’। টোল ফ্রি নম্বরও বদলানো হবে। বিজেপির রাজ্য সভাপতি তথা সাংসদ শমীক ভট্টাচার্য নতুন নামটি ঠিক করেছেন বলেও জানান শুভেন্দু।

আরও একটি বড় ঘোষণা করেন তিনি— সরকারি বাসে মহিলাদের বিনামূল্যে যাতায়াতের সুবিধা এবার কার্যকর হচ্ছে। ভবিষ্যতে এ জন্য বিশেষ কার্ডও চালু করা হতে পারে।

এর পাশাপাশি পরিবেশ দিবস উপলক্ষে ‘এক পেড় মা কে নাম’ কর্মসূচি পালন, জনকল্যাণ শিবির আয়োজন এবং আয়ুষ দফতরকে স্বাস্থ্য দফতর থেকে আলাদা করার নীতিগত সিদ্ধান্তের কথাও ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী।

সব মিলিয়ে কল্যাণীর প্রশাসনিক বৈঠক যেন একপ্রকার রাজনৈতিক মঞ্চে পরিণত হল মঙ্গলবার।
অন্নপূর্ণা যোজনার ফর্ম প্রকাশের আগেই উত্তেজনা তুঙ্গে। এখন সবার নজর বুধবারের দিকে— সত্যিই কি ১ জুন থেকেই শুরু হবে নতুন আর্থিক সুবিধা? আর এই নতুন প্রকল্প বাংলার ভোট রাজনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলবে?
প্রশ্নটা এখন সেখানেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *