কলকাতা হাইকোর্টের ৯ জুলাইয়ের নির্দেশেই সিলমোহর শীর্ষ আদালতের—চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে নজর এখন স্পেশাল অফিসারের দিকে
সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
নয়াদিল্লি: ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ নিয়ে আইনি লড়াইয়ে বড় স্বস্তি পেল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-পন্থী তৃণমূল কংগ্রেস [Mamata Banerjee | TMC]। কলকাতা হাইকোর্ট [Calcutta High Court] যে অন্তর্বর্তী নির্দেশ দিয়েছিল, তা-ই বহাল রাখল সুপ্রিম কোর্ট [Supreme Court of India]। ফলে নির্দিষ্ট তিনটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থেকে দলের দৈনন্দিন এবং প্রশাসনিক খরচ চালানোর জন্য অর্থ ব্যবহারের পথ আপাতত খোলা থাকল।
মঙ্গলবার বিচারপতি এমএম সুন্দরেশ [Justice M.M. Sundresh] এবং বিচারপতি পিবি ভারালে [Justice P.B. Varale]-র বেঞ্চে এই মামলার শুনানি হয়। দীর্ঘ শুনানিতে তৃণমূলের হয়ে দলের আর্থিক প্রয়োজন এবং অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ হয়ে যাওয়ার প্রভাব তুলে ধরেন আইনজীবী কপিল সিব্বল [Kapil Sibal]।
শেষ পর্যন্ত কলকাতা হাইকোর্টের ৯ জুলাইয়ের নির্দেশে হস্তক্ষেপ করেনি শীর্ষ আদালত।
কী নির্দেশ দিয়েছিল হাইকোর্ট?
অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ মামলায় ৯ জুলাই কলকাতা হাইকোর্ট তৃণমূলের তিনটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থেকে দৈনন্দিন ও প্রশাসনিক কাজের জন্য অর্থ ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছিল।
সেই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করা হয়। একইসঙ্গে দলের অ্যাকাউন্ট থেকে অর্থ ব্যবহারের অধিকার নিয়ে অন্য দাবিদারদের পক্ষ থেকেও আবেদন সামনে আসে।
মঙ্গলবার সেই মামলাতেই গুরুত্বপূর্ণ শুনানি হয়।
তৃণমূলের হয়ে সওয়াল করতে গিয়ে কপিল সিব্বল প্রথমেই দলের মাসিক পরিচালন ব্যয়ের বিষয়টি আদালতের সামনে তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য, অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ থাকায় দলের কর্মীদের বেতন দেওয়া-সহ দৈনন্দিন কাজ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
‘৬০ কোটি টাকার মামলায় ৪০০ কোটি কেন?’
শুনানিতে সিব্বলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি ছিল বাজেয়াপ্ত অর্থের পরিমাণ নিয়ে। তাঁর দাবি, ইডি [Enforcement Directorate] যে মামলায় প্রায় ৬০ কোটি টাকার ‘প্রসিডস অফ ক্রাইম’-এর কথা বলেছে, সেখানে ব্যাঙ্কে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা আটকে রাখা হয়েছে।
তাঁর প্রশ্ন, অভিযোগের পরিমাণের তুলনায় এত বিপুল অর্থ কেন আটকে রাখা হবে?
তৃণমূলের আইনজীবীর বক্তব্য, অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ হয়ে থাকায় দলের কর্মীদের বেতন দেওয়া যাচ্ছে না এবং সাংগঠনিক কাজ চালাতেও সমস্যা হচ্ছে।
অন্যদিকে ইডির পক্ষ থেকে পাল্টা যুক্তি দেওয়া হয়, একটি অ্যাকাউন্টেই মাত্র ২০ দিনের মধ্যে প্রায় ৩৬০ কোটি টাকা জমা পড়েছিল। তদন্তের স্বার্থেই অ্যাকাউন্ট সংক্রান্ত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার বক্তব্য।
স্পেশাল অফিসারের হাতেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
শুনানিতে উঠে আসে কলকাতা হাইকোর্টের নিযুক্ত স্পেশাল অফিসারের বিষয়টিও। তৃণমূলের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, দলের দৈনন্দিন কাজ চালানোর জন্য অর্থ ব্যবহারের বিষয়ে অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা উঠলেই সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টগুলিকে ফের ফ্রিজ করা হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করে দিয়েছে, কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশ বহাল থাকবে। তবে নির্দিষ্ট অর্থ ব্যবহার করা হবে কি না, সেই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব থাকবে হাইকোর্ট নিযুক্ত স্পেশাল অফিসারের উপর।
অর্থাৎ, সুপ্রিম কোর্ট সরাসরি অর্থ ছাড়ের নির্দেশ দেয়নি; বরং হাইকোর্টের নির্ধারিত প্রক্রিয়াকেই বহাল রেখেছে।
বিশ্বনাথ দাসের আবেদনে কী বলল শীর্ষ আদালত?
এদিকে ঋত ব্লকের বিধায়ক বিশ্বনাথ দাস [Biswanath Das]-এর আবেদনও শুনানিতে সামনে আসে। তাঁর পক্ষ থেকে দলের অ্যাকাউন্ট থেকে অর্থ ব্যবহারের অধিকার নিয়ে দাবি তোলা হয়েছিল।
এই বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের বার্তা স্পষ্ট—হাইকোর্ট নিযুক্ত স্পেশাল অফিসারের কাছেই আবেদন জানাতে হবে। যদি দলের উপর সংশ্লিষ্ট অধিকার বা দাবির আইনি ভিত্তি থাকে, তাহলে স্পেশাল অফিসার তা খতিয়ে দেখবেন।
তৃণমূলের পক্ষে কপিল সিব্বলের পাশাপাশি অভিষেক মনু সিংভি [Abhishek Manu Singhvi] এবং মানেকা গুরুস্বামী [Menaka Guruswamy] সওয়াল করেন।
রাজনীতিতে নতুন চাপানউতোরের ইঙ্গিত?
অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ নিয়ে আইনি লড়াই এখনই শেষ হচ্ছে না। সুপ্রিম কোর্ট হাইকোর্টের নির্দেশ বহাল রাখায় মমতা-পন্থী তৃণমূল আপাতত বড় স্বস্তি পেলেও, অর্থ ব্যবহারের প্রতিটি সিদ্ধান্ত এখন নির্ভর করবে হাইকোর্ট নিযুক্ত স্পেশাল অফিসারের পরবর্তী পদক্ষেপের উপর।
একদিকে দলের দৈনন্দিন খরচ চালানোর প্রশ্ন, অন্যদিকে তদন্তকারী সংস্থার আর্থিক লেনদেন নিয়ে আপত্তি—দুইয়ের মাঝখানে আইনি লড়াই আরও কতদূর গড়ায়, সেটাই এখন দেখার।
তিনটি অ্যাকাউন্ট থেকে অর্থ ব্যবহারের পথ আপাতত বন্ধ হল না—কিন্তু সেই অর্থ বাস্তবে কতটা এবং কীভাবে ব্যবহার করা যাবে, এবার কি সেই সিদ্ধান্তই তৃণমূলের জন্য নতুন আইনি পরীক্ষার মঞ্চ হয়ে উঠতে চলেছে?